কর্মসূচি-নিষেধাজ্ঞায় রাজধানীজুড়ে শঙ্কা

কোনো রকম অঘটন ছাড়াই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শুক্রবারের পাল্টাপাল্টি সমাবেশের সমাপ্তি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারত। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সে কর্মসূচি থেকেই শুরু হলো নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ করে বিএনপি। সেখান থেকেই পরের দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। সে অনুযায়ী শনিবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর চারটি প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি পালনের কথা তাদের। 

বিএনপির সাথে তাল মিলিয়ে তাদের যুগপৎ শরিকরাও একই কর্মসূচি দিয়েছে। এর মাধ্যমেই ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চলমান আন্দোলনকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে চায় দলটি।

এদিকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে বাদ জুমা শান্তি সমাবেশ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ। অন্যদিকে বিরোধীদের লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণার পর একই স্থানে পাল্টা কর্মসূচি দেয় মহানগর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ। বিএনপিকে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়ে দেন দলটির নেতারা।

দুই দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ঘোষণায় নগরবাসীর মনে তৈরি হয় শঙ্কা। কিন্তু ঘটনার পট পাল্টাতে থাকে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে। এসময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় আজকের কর্মসূচির জন্য কোনো দলেই তাদের কাছ থেকে অনুমতি নেয়নি।

সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক জানান, শনিবার (আজ) বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ঢাকার সব প্রবেশমুখে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে তাদের কেউ ডিএমপির কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো অনুমতি নেয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে কোনো দলকেই এ কমসূচি পালনের অনুমতি দেয়নি ডিএমপি। 

এরপরই শান্তি সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের পূর্ব ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে প্রতিটি থানা ওয়ার্ড কার্যালয়ে নেতাকর্মীরা সতর্ক পাহারা দেবেন।

শুক্রবারের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে কয়েক মাস ধরে দুপক্ষ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেও হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কোনো রকম অঘটন ছাড়াই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শুক্রবারের বৃহৎ জনসমাবেশের সমাপ্তি সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারত। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সেই সমাবেশ থেকেই রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা শুরু হলো।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গণমাধ্যমকে জানান, ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুদলই নিজেদের অনস্থানে অনঢ়। এমন পরিস্থিতি তাদের আচরণকে প্রভাবিত করে। আগামী দিনে এরকম কী ঘটবে না ঘটবে, আমরা জানি না। বাস্তবতা কল্পনাকেও হার মানায়। যদি নিজেরা আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে পারি, তাহলে ভালো। তা না হলে নিয়তি এ দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।’ 

গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজারের ব্যস্ত সড়কও ছিল ফাকা। ছবি: আবদুল্লাহ আল মামুন

রাজধানীতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে নগরবাসীর আগের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো না। পুলিশের নজরদারি তল্লাশী ও জানবাহন সংকটে আগেও নাকাল হতে হয়েছে নগরবাসীকে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে শুক্রবারও। এদিন সকাল থেকে পুলিশি তল্লাশিতে ভোগান্তির পাশাপাশি হয়রানির অভিযোগ করন যাত্রীরা। তাদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও ব্যাগ, মুঠোফোন তল্লাশি করা হয়েছে। এতে অনেকেই হয়েছেন বিরক্ত ক্ষোভের স্বরে বলেছেন তল্লাশির নামে এটা যাত্রী হয়রানি ছাড়া আর কিছু না।

গতকাল সহিংসতার আশঙ্কায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছিলেন অনেক বাস মালিক। এদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রুটের বাস রাস্তার পাশে পার্কিং করে রাখতে দেখা যায়। এদিন রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কের মোড়ে গণপরিবহনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে নগরবাসীকে। সকাল থেকেই রাজধানীর শনিরআখড়া, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্থান, প্রেসক্লাব, হাইকোর্ট মোড়, শিক্ষা ভবন, কাকরাইল, শান্তিনগর, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, বিশ্বরোড, গাবতলী, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, ফার্মগেট, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল খুবই কম ছিল। ফলে তীব্র গণপরিবহন সংকটে পড়েন নগরবাসী। গতকালের মতো আজকের কর্মসূচী ও এর ওপর পুলিশি নিষেধাজ্ঞায় জনজীবনে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

রাজধানীর পল্লবী থেকে কাওরান বাজারগামী যাত্রী দিদারুল করিম জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই কোনও গাড়ি পাইনি। সিএনজি অটোরিক্সাও কম চলাচল করছে। ভাড়া চাচ্ছে ৬০০ টাকা। রিক্সা নিলাম, ভেঙে ভেঙে যাবো। যাওয়ার পথে দেখলাম রাস্তার পাশে বাস পার্ক করা।

শুক্রবার ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর অবস্থানে ছিল পুলিশ।

ঢাকায় বেসরকারি চাকরি করেন ছাব্বির হোসেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হতে চেয়েছিলাম। তবে শুক্রবারের মতো রাস্তায় গণপরিবহন কম থাকলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের সিএনজি অটোরিক্সা ভাড়া করে যাওয়া কষ্টের হয়ে যাবে।

তবে সব ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। রাজধানীতে আসা-যাওয়ার সড়ক দখলে নিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, জনদুর্ভোগ হয়, রাস্তা বন্ধ হয় এমন কর্মসূচি থেকে সরে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সবসময়ই পুলিশ অনুরোধ জানিয়ে আসছে। কাউকে রাজধানীতে আসা-যাওয়ার সড়ক দখলে নিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। 

এ প্রসঙ্গে একই কথা জানান ডিএমপি কমিশনার। বলেন, ‘মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি হলেও প্রবেশপথ সামান্য সময় আটকা থাকলে অনেক গাড়ির জটলা তৈরি হয়ে যায়। প্রবেশমুখে অবস্থান নিলে ব্যাপক জনদুর্ভোগ হবে। এর ব্যতয় হলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’