পবিত্র আশুরা: জয় হউক ন্যায় ও সত্যের

আজ ১০ মুহররম। পবিত্র আশুরা। আরবি ‘আশুরা’ শব্দটি ‘আশরুন’ শব্দ হইতে উদ্গত। ইহা একটি ক্রমবাচক শব্দ, যাহার অর্থ দশম। ইসলামের দৃষ্টিতে হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা। বিশ্বজগতের প্রারম্ভকাল হইতেই এই দিবসটি বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত। আরব দেশে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও সফর—এই চারটি মাস অধিক মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসগুলিকে একত্রে বলা হয়, আশহারুল হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহ। পবিত্র কুরআন কারিমের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে এই ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে। অর্থাত্ মুহাররম পবিত্র মাস, আর এই মাসের আশুরা তথা দশম তারিখ এই মাসটিকে করিয়াছে আরো মহিমান্বিত। কেননা এই পবিত্র দিনে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে দুনিয়া সৃষ্টি হইয়াছে। আবার কিয়ামতও সংঘটিত হইবে এই দিনে। এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন প্রায় ২ হাজার পয়গম্বর। আদিপিতা হজরত আদমের (আ.) দেহে পাক রুহ প্রদান, মা হাওয়াকে (আ.) পয়দা, মহাপ্লাবন শেষে হজরত নুহ নবির (আ.) জুদি পাহাড়ে অবতরণ, নমরুদের অগ্নিকাণ্ড হইতে মিল্লাতে আবা ইব্রাহিমের (আ.) নাজাত, ৪০ দিন মাছের পেটে থাকিবার পর হজরত ইউনুসের (আ.) নিষ্কৃতি, হজরত আইউবের (আ.) ১৮ বত্সর পর রোগমুক্তি, হজরত মুসার (আ.) নীল নদ পাড়িদান ও ফেরাউনের সলিল সমাধি, হজরত ঈসার (আ.) ঊর্ধ্বাকাশে গমন প্রভৃতি অসংখ্য আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই দিবসটি।

উপর্যুক্ত কারণে আশুরা হইতেছে একটি শুকরিয়া দিবস। কিন্তু ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬১ হিজরির ১০ মহররমের এই দিনেই ঘটে বিশ্ব মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচাইতে মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত ঘটনা। এই দিনে বর্তমান ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরুপ্রান্তরে আখেরি নবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর প্রিয় দৌহিত্র এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলি ও খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুয জাহরার (রা.) আদরের পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এই হিসাবে আশুরা শোকাবহ একটি দিনের চিরন্তন প্রতীকও বটে। ঐদিন ইমাম হুসাইন (রা.)সহ তাহার ৭২ জন সঙ্গী-সাথি শহিদ হন, যাহাদের অধিকাংশই ছিলেন আহলে বায়াত বা নবির (স.) বংশধর। কারবালার এই মর্মন্তুদ ঘটনা কুটিলতা ও নৃশংসতার দৃষ্টান্ত হিসাবে ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়। উল্লেখ্য, রমজানের রোজার পূর্বে আশুরার রোজাই ছিল অবশ্য পালনীয়। এই জন্য পবিত্র আশুরার দিনে অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি রোজা রাখা উত্তম। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে রমজানের পর মহররমের এই রোজাকে সর্বোত্তম বলা হইয়াছে। যাহাতে অন্য ধর্মের সহিত সাদৃশ্য না হয়, এই জন্য আশুরার দিনের আগে বা পরে মিলাইয়া দুইটি রোজা রাখিবার নিয়ম রহিয়াছে।

পবিত্র আশুরার প্রধান শিক্ষাই হইল এক আল্লাহর নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও নিরন্তর তাহার শুকরিয়া আদায় করা। দ্বিতীয়ত কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের নিকট মাথা নত না করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো আত্মত্যাগকে হাসিমুখে বরণ করা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়—‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ তাই পবিত্র আশুরার দিন আমাদের প্রার্থনা—জয় হউক ন্যায় ও সত্যের।