কত বছর পর দেখা লাল-হলুদের পুরোনো মুখগুলোর

ইস্ট বেঙ্গলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সকাল বেলা এক-দেড়শ সমর্থক জার্সি গায়ে হাজির। মাথায় ব্যান্ড, হাতে পতাকা। স্লোগান দিয়ে মাতিয়ে দিয়েছে গড়ের মাঠ। আশপাশ এলাকায় মোহামেডান, মোহন বাগান ক্লাব। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছিল সেই আওয়াজ। ছোট ছোট বাচ্চারাও এসেছে ইস্ট বেঙ্গলের জাসি গায়ে। 

সরকারি চাকুরে রিতম সরকার বললেন, ‘একদম, মনের ভেতর, হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দলটি।’ আমার মা-বাবা, ভাই সবাই লাল-হলুদের লাইফটাইম মেম্বার, আমিও-বললেন টালীগঞ্জ থেকে আসা সুদীপ্ত কুন্ডু। এরই মধ্যে ইস্ট বেঙ্গলের গেটে এসে একে একে গাড়ি থেকে নামছেন বাঙ্ঘলার ফুটবলের কিংবদন্তি শেখ মো. আসলাম, গোলাম গাউস, ৯১ লিগ চ্যাম্পিয়ন ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের অধিনায়ক আক্রমণভাগের ক্ষীপ্রগতির ফুটবলার বিকাশ পাজি, যার খেলার কথা পড়তে হতো খেলার আসর পত্রিকায়। ছিলেন স্ট্রাইকার মিহির বোস। সবাইকে নিয়ে কেক কাটা হলো। দলের পতাকা উড়ানো হলো। সবাই স্লোগান দিয়ে উঠলো ইস্ট বেঙ্গল জিন্দাবাদ।

এর মাঝে সবখানেই আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা।  যার গল্প তুললেন শেখ আসলাম। ইস্ট বেঙ্গলের দেবাশিস সরকার বললেন, ‘৭৭ সালে লিগে মোহন বাগানের বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রিকিকের বল তুলে দিয়েছিলেন পিন্টু চৌধুরি। শূন্যে ভাসা সেই বলের ওপর পা চালিয়ে দিলেন মিহির বোস। ছবির মতো গোল দেখেছেন দর্শক। 

আসলাম বলেই ফেললেন, এমন স্ট্রাইকার আর পাওয়া যাবে না। মিহির বোস বললেন, ‘আমি ঘটি বাড়ির ছেলে। খেলেছি ইস্ট বেঙ্গলে। ইস্ট বেঙ্গল জিতলে খাবে ইলিশ মাছ। মোহন বাগান জিতলে চিংড়ি খাবে। আমার পছন্দ ইলিশ মাছ।’ পাশেই ছিলেন স্টপার তরুণ দে, নীরব মানুষ। খুব একটা হাসেন না। তবে আসলাম বলে উঠলেন, ‘খুব ভালো গান গায় তরুণ।’

৮৭’ সালে মোহামেডান-আবাহনী ম্যাচ। আবাহনীর সেট ভেঙে দিয়ে চিমা, গোলকিপার ভাস্কর গাঙ্গুলিকে নামিয়েছিল। সেই ম্যাচ হেরেছিল আবাহনী। ভাস্কর গাঙ্গুলি বলেন, ‘ধুর। আমার ওসব মনে নেই।’ ঢাকার ফুটবলের দর্শকের মনে আছে। ভাস্কর গাঙ্গুলির নাকি সেই ম্যাচের ঘটনা মনে নেই। 

‘গোল না খেলে দোষ ধরবে কীভাবে। স্ট্রাইকাররা গোল মিস করে। এটাই হয়-বললেন ১৫ বছর লাল-হলুদে খেলা ভাস্কর।’ বয়স ৬৭, হাঁটুর ব্যথায় বসেই কথা বলেন। এখনো শরীরটা যেন একটুও ভাঙ্গেনি। রোজই ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব পাড়ায় আসেন। তার স্ত্রী এই ক্লাবের সদস্য। একমাত্র ছেলে ফুটবল খেলতেন, এখন চাকরি করেন। কথায় কথায় সবার সঙ্গে মজা করা তার অভ্যাস। আশীষ ভদ্রর সঙ্গে নাকি কথা হয়। এবার আসলামের কাছে শুনলেন গোলাম রাব্বানী হেলাল মারা গেছেন।

অধিনায়ক বিকাশ পাজি দেখতে খুবই সুন্দর। গায়ের রং ফর্সা। আসলামকে পেয়ে দারুণ খুশি। ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন কয়ে দিয়ে গেছেন আসলাম, মুন্না, গাউসরা। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন বিকাশ পাজি। কত বছর পর দেখা। তারপরও তাদের কথা শুনে, তাদের আনন্দ দেখে, মনেই হলো না ২২ বছর পর দেখা হয়েছে। 

সাব্বিরের কথা জিজ্ঞেস করলেন বিকাশ পাজি। ঢাকার মাঠে ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি গায়ে খেলেছেন। নানা আলোচনায় সকাল গড়িয়ে সূর্য মধ্যগগণে। তখনো ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের আঙ্গিনায় শত সমর্থকের ভীড়। কেউ যাচ্ছেন, কেউ আসছে। ভীড় কমছে না। উৎসব দেখে মনে হবে না যে এই দলটি লিগ ট্রফি পায় না অনেক বছর। 

মাত্রই এইচএসসি পাশ করেছেন গড়িয়ার ছেলে শুভ্রাংশু। বললেন, ‘সবারই একটা খারাপ সময় থাকে। আমাদেরও (ইস্ট বেঙ্গল) চলছে। এবার ভালো দল হয়েছে।’ 

লিগ ট্রফি না জিতলেও নাকি জাদবপুরের রিন্টু ভালোবাসেন ইস্ট বেঙ্গলকে। রিতম, সুদীপ্ত কিংবা অমিত বোসদের মতো শত সমর্থকের মুখে একটাই কথা-ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়েই আছি আর থাকব।’