সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সমাদৃত হয়েছে। এ স্বীকৃতি অর্জনের পেছনে রয়েছে আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভূমিকা। এর সঙ্গে মোট দেশজ উত্পাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) রেকর্ড করা হয়েছে গড়ে ৬ শতাংশ হারে। এ প্রবৃদ্ধির হার প্রশংসাজনক। গত অর্থবছরে অর্থাত্ ২০২২-২০২৩-এ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে কোনোভাবে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সামাল দেওয়া সহজ কাজ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা দেখা দিলে সমস্ত চাপ আসে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত কারেন্ট অ্যাকাউন্ট (চলতি হিসাব), ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট (আর্থিক হিসাব)-এর অবস্থা দেখে বোঝা যায় সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু চিত্র। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাবের প্রভাব পড়ে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ওপর। অবশেষে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে বহুল আলোচিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর। বর্তমান কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটটি কীভাবে কমানো সম্ভব? এর সমাধান কোথায়? এর সমাধান হলো রপ্তানি ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনা, নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি করা এবং রপ্তানি আয় বাড়ানো। প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স রপ্তানি আয়ের সঙ্গে যোগ হলে অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করা সম্ভব, যা বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। এর অধিকাংশ আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। যার একচেটিয়া বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত ( ইইউ) দেশগুলো। বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইইউ দেশগুলো থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। বর্তমানে মোট রপ্তানির ৭৩ শতাংশের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে বাংলাদেশ। জিএসপি অন্তর্ভুক্ত তিনটি সুবিধার মধ্যে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে এভরিথিংক বাট আর্মস (ইবিএ)-এর আওতায়। অবশিষ্ট দুটি সুবিধা হলো জিএসপি প্লাস এবং জিএসপি স্ট্যান্ডার্ড। গুরুত্বপূর্ণ খবর যে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ বা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হলে ইইউ থেকে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও এ সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। অস্ট্রেলিয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে ২০৩২ সাল পর্যন্ত। এরপর বাংলাদেশ ইইউ থেকে জিএসপি প্লাস সুবিধার আওতায় পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। এ সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে অনেকগুলো শর্ত পূরণ করতে হবে। ইইউ থেকে দেওয়া ৩২ কনভেনশন পালন করতে ব্যর্থ হলে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া যাবে না। বর্তমানে শূন্য শুল্কের বিপরীতে ৯ শতাংশের বেশি শুল্ক দিয়ে ইইউ বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে হবে, যদি জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বা প্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। ২০২৬ সালের পর বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে যদি মুক্তবাণিজ্য চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর না করে।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার সমকক্ষ অর্থনীতি থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনামের সঙ্গে ১৫টি দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। কম্বোডিয়ার সঙ্গে আছে ৯টি দেশের, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ১৭টি দেশের, ভারতের সঙ্গে ১৫টি দেশের, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ১৯টি দেশ, জাপানের সঙ্গে ২০টি দেশ, চীনের সঙ্গে ২২টি দেশ এবং সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ২৭টি দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। দুঃখের বিষয় যে, ২০২০ সালে ভুটান ও বাংলাদেশের ভেতর যে প্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (প্রিফারয়েনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট) স্বাক্ষরিত হলেও এর সুফল এখনো পুরোপুরি দেখা যায় নাই। এ চুক্তির আওতায় ভুটানের ৩৪ পণ্য এবং বাংলাদেশের ১০০ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার জন্য বাংলাদেশ অনেক দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ আলোচনা আদৌ ফলপ্রসূ হবে কি না জানি না। বিভিন্ন ব্লকের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। ২৩টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বা প্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি করার জন্য বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করেছেন। প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে। মুক্ত বা প্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি করার জন্য যে সমস্ত দেশ তালিকায় রয়েছে, তা হলো চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে এবং ইউরেশিয়ান কাস্টমস ইউনিয়ন। ভারতের সঙ্গে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারসিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) করার চিন্তাভাবনা চলছে। কানাডার সঙ্গেও সিইপিএ বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হতে পারে।
যে দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বা প্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি করার চিন্তাভাবনা চলছে, সে দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি করলে বাংলাদেশ লাভবান হবে কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যদি কোনো দেশের ব্যাপক আকারে বাণিজ্য ঘাটতি থাকে অর্থাত্ বৈদেশিক বাণিজ্য যদি বাংলাদেশের অনুকূলে না থাকে, সেক্ষেত্রে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কতটুকু ফলপ্রসূ হবে? এটা নিয়েও ভাবতে হবে। যদি কোনো চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্যসুবিধার পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আনার সুযোগ থাকে, ঐ সমস্ত চুক্তি করা শ্রেয়। যেমন সিইপিএ-এর মাধ্যমে শুধু বাণিজ্যসুবিধা নয়, বিনিয়োগ এবং পর্যটনের সুবিধাও পাওয়া যায়। যেহেতু বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ৭৬ শতাংশ হয়ে থাকে ১২টি দেশে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ভারত, জাপান, পোল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া। এসব দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করলে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে লাভবান হবে। বিশেষ করে, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনার সঙ্গে চুক্তি করলে এর ফলাফল ভবিষ্যতে ভালো হবে। কারণ, এ দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে একসময় বেশি বেশি পণ্য আমদানি করবে। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ এশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা)-এর অধীনে ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে শুল্কসংক্রান্ত সুবিধা পেলেও এতটা প্রশংসনীয় নয়।
এই মুহূর্তে শুল্কসুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ-সুবিধা পাওয়া অতীব জরুরি। বাংলাদেশে এখন ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আনার কৌশল হলো বিভিন্ন ট্রেড ব্লকে যোগদান করা। ট্রেড ব্লকে যোগদান করার সুযোগ যদি বাংলাদেশ পেয়ে থাকে, তাহলে এ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ট্রেড ব্লক—রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসেপ)-এ যোগদান করার জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছে। আরসেপ নিয়ে আমি একটা কলাম লিখেছিলাম। আমার কলামে বলেছিলাম যে, বাংলাদেশকে আরসেপ ব্লকে যোগদান করা প্রয়োজন। কেন প্রয়োজন, সেটা বিস্তারিত বলেছিলাম। বৃহত্ অর্থনৈতিক স্বার্থে আরসেপে যোগদান করা সময়ের দাবি। কেন এত দেরিতে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নিল তা আমার জানা নাই। কর্তাব্যক্তিরা কি প্রথমে জানতেন না যে, আরসেপে যোগদান করলে বাংলাদেশ কী পরিমাণ সুবিধা ভোগ করবে? আমার এই কলামে আরসেপের গুরুত্ব সম্পর্কে আবার বলতে চাই। আরসেপের ১৫ সদস্য দেশগুলো হলো ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাউস, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড। আসিয়ান থেকে ১০টি দেশ রয়েছে। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না বাংলাদেশ (শুধু অস্ট্রেলিয়া সুবিধা দেবে ২০৩২ সাল পর্যন্ত) । এ দেশগুলো আরসেপের সদস্য। এখন বাংলাদেশ যদি আরসেপ ব্লকে যোগদান করে, তাহলে এ দেশগুলোর সঙ্গে শুল্কমুক্তসুবিধা বহাল থাকবে। এছাড়াও, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাউস হলো আরসেপের সদস্য, যারা বাংলাদেশের এখন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ। এ তিনটি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আরসেপে যোগদান করতে হবে। আরসেপে যোগদান করলে বাংলাদেশকে নতুন করে এই ১৫টি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার প্রয়োজন নেই। সদস্য দেশগুলোর ভেতর অনায়াসে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করা যাবে। এছাড়াও, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবে। ট্যারিফ কমিশনের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আরসেপে যোগদান করলে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়ে যাবে ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আর জিডিপি বাড়বে ০ দশমিক ২৩ শতাংশ। আরসেপ ব্লক থেকে বাংলাদেশ শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশ যদি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করতে ব্যর্থ হয় এবং আরসেপে যোগদান না করে, এর খেসারত একদিন দিতেই হবে। সেদিন বেশি দূরে নয়। দুঃখজনক যে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য এখনো মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে নাই।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক