তিনি যুবসমাজের অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারুণ্যের রোল মডেল শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় দাদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিক স্নেহে বেড়ে ওঠা ক্ষণজন্মা এই যুবক ছিলেন অমায়িক, বিনয়ী, উদার চিন্তার, নিরঅহংকারী এবং বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তার শৈশব কেটেছে পিতার স্নেহ ও ভালোবাসা ছাড়া মায়ের আদর-যত্নে। কেননা পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন বাংলার জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রামে ব্যস্ত আর কারান্তরীণ। তার পরও শেখ কামাল বেড়ে উঠেছেন যথাযথ শিক্ষা আর মানবিক মানুষ হিসেবে।

শেখ কামালের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে। মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক (সম্মান) পাশ করে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পরীক্ষা শেষ করেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট মাত্র ২৬ বছর বয়সে তাকে হত্যা করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় জনগণের মধ্যে, যেখানে শেখ কামালকে হেয় করার দুরঅভিসন্ধি ছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য আজ সবার কাছে প্রকাশিত—শেখ কামাল ছিলেন একজন অনন্য অসাধারণ যুবসমাজের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।

বহুবিধ গুণের অধিকারী শেখ কামালের জীবনীতে দেখা যায় বহুমাত্রিকতা। এই আলোচনায় শেখ কামালের বহুমাত্রিকতাকে তিনটি ভাগে উপস্থাপন করার প্রয়াস রয়েছে। প্রথমত, ছাত্রজীবনে তার নেতৃত্ব ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ। যেখানে দেখা যায় ছাত্রজীবন থেকেই শেখ কামাল তার পিতার আদর্শে বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন শেখ কামাল। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি সক্রিয় নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ কামাল ওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কমিশন্ড লাভ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি ওসমানীর এডিসি নিযুক্ত হন।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শেখ কামাল যুদ্ধপূর্ব ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। সুতরাং দেখা যায়, ছাত্রজীবনে শেখ কামাল তার সক্রিয় ভূমিকার কারণে অনন্য ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, শেখ কামাল ছিলেন একজন ক্রীড়াবিদ এবং ক্রীড়া সংগঠক। খেলাধুলার ক্ষেত্রে পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী ছিলেন শেখ কামাল। কেননা তার দাদা এবং পিতা দুই জনই ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী। খেলাধুলার মধ্যে ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল এবং হকি খেলাতে শেখ কামালের আগ্রহ ছিল। তবে এর মধ্যে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলার প্রতি আগ্রহ বেশি ছিল বলে মনে হয়। আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে শেখ কামাল প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলেছেন অনেক দিন। এই ক্রিকেট খেলা ছাড়াও তিনি ফুটবল ও বাস্কেটবল খেলতেন। এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। উল্লিখিত প্রতিটি খেলায় তার আগ্রহ ছিল।

১৯৬৮ সালেই তিনি ধানমন্ডি ক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। অর্থাত্ মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তবে স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এ আবাহনী সমাজকল্যাণ সংস্থা গঠন করেন তিনি, ধানমন্ডি সাতমসজিদ রোড এলাকায় সমমনা কিছু যুবককে নিয়ে। এই সংস্থার নামে সংগঠিত করেন ফুটবল দল ইকবাল স্পোর্টিং আর ক্রিকেট এবং হকি খেলার দল ইস্পাহানী স্পোর্টিং। এরপর উল্লিখিত দলকে এক করে গঠন করেন আবাহনী ক্রীড়াচক্র। সুতরাং ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে শেখ কামাল ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্ব।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে শেখ কামাল প্রথম ১৯৭৩ সালে ফুটবলের জন্য বিদেশি কোচ বিল হার্টকে নিযুক্ত করেন, যা ছিল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ক্ষেত্রে উদ্দীপনার আশাব্যঞ্জক আর প্রেরণামূলক। শেখ কামাল শৈশব থেকে শুরু করে যুবক সময় পর্যন্ত ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল, হকি প্রতিটি খেলায় আগ্রহ দেখিয়েছেন একদিকে ক্রীড়াবিদ হিসেবে, অন্যদিকে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। যার ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ ক্রীড়াক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে এগিয়ে চলেছে। তৃতীয়ত, শেখ কামাল ছিলেন একাধারে সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মঞ্চ ও যন্ত্রশিল্পী। লেখাপড়ার পাশাপাশি শেখ কামাল সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সংগীত সংগঠন স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী। এছাড়া নাটকের দল ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। তিনি একাধারে মঞ্চ নাটক, সেতারবাদনসহ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনেও তার পদচারণা ছিল উল্লেখযোগ্য অভিনেতা হিসেবে। তিনি কলকাতা মঞ্চেও অভিনয় করেছেন বলে জানা যায়। শেখ কামাল ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছায়ানটে তিনি সেতারবাদনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ভালো সেতার বাজাতেন।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, তৎকালীন পাকিস্তানের আইয়ুব সরকার যখন রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করেছিলেন, তখন বাংলার সব সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গে রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে শেখ কামাল সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। সুতরাং একদিকে সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে সংগঠক, অন্যদিকে মঞ্চ নাটক ও সংগীতে পারদর্শিতার গুণাবলি শেখ কামালকে অনন্যসাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মী, সংগঠক ও শিল্পী হিসেবে বিকশিত করেছে। সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মঞ্চ ও সেতারশিল্পী—এই তিন গুণাবলির সমন্বয়ে শেখ কামাল হয়ে উঠেছেন অনন্য মর্যাদার ব্যক্তিত্ব।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সব মানুষের জীবন ও চর্চায় বহুমাত্রিকতা থাকে না। বিশেষ বিশেষ গুণাবলির বিশেষত্বে কিছু মানুষ অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। কিন্তু শেখ কামাল বহুমাত্রিক গুণাবলির সমন্বয়ে গড়ে উঠছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের তরুণ ও যুবকরা সমাজ পরিবর্তন তথা স্থানান্তরের সন্ধিক্ষণে রয়েছেন বর্তমান সময়ে। বর্তমান বাংলাদেশ প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অবস্থান্তর আর স্থানান্তরের ধারাবাহিকতায় চলমান। আর এই চলমান স্থানান্তরের অবস্থা ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। তাই এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা মোকাবিলায় দেশের তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজের মন ও মননে গঠনমূলক সচেতনতা সঠিক সাংস্কৃতিক আবহ প্রতিষ্ঠা, উদ্যমী নেতৃত্ব তৈরি করা খুব জরুরি। আরো প্রয়োজন সমাজের বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের কাছে আকর্ষণীয়, আগ্রহের ব্যক্তিত্ব সর্বোপরি রোল মডেল হিসেবে অনুসরণীয় ব্যক্তিকে তুলে ধরা। অতএব একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র শহিদ শেখ কামাল যে বহুমাত্রিক গুণের অনন্য ব্যক্তিত্ব, তা বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয় করে তোলা প্রয়োজন।

লেখক: উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়