গতকাল শনিবার (৫ আগস্ট) শহীদ ক্যাপ্টেন মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের ৭৪তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করল দেশের ক্রীড়াঙ্গন। শেখ কামালের জন্মবার্ষিকীর দিনে গতকাল সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবং দুই প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার তুলে দিয়েছেন।
শেখ কামাল ক্রীড়া পুরস্কার গ্রহণ করে পুরস্কৃতরা উচ্ছ্বসিত। পুরোনো প্রজন্ম আবেগ আপ্লুত। নতুন প্রজন্ম উৎসাহিত। শুধু পুরস্কারপ্রাপ্তরাই নয়, তাদের সঙ্গে আসা মানুষগুলোর মধ্যেও ছিল বাড়তি আনন্দ। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষগুলো পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন দিয়েই যাচ্ছিলেন। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর দেখা, একসঙ্গে খেলাধুলার মাঠে, মাঠের বাইরে কত ইতিহাসের গল্প একজন আরেক জনকে বলছিলেন আবেগে ভাসা পদকপ্রাপ্তরা। এরই মধ্যে কারো কারো চোখে জল এসে গেল। আনন্দের জলে ভাসল। চোখে জল দেখে অন্যরাও খুশি।
ষাটের দশকের জনপ্রিয় হকি খেলোয়াড় আব্দুস সাদেক। অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলে খেলেছেন তিনি। আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন বাংলাদেশ হকি দলের প্রথম অধিনায়ক আব্দুস সাদেক। তিনি আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন।
মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করে ফিরে সাদেক বললেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, আজকে পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। ২৬ বছর আগে আপনার হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছিলাম, জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার। এবার শেখ কামালের পুরস্কার পেলাম। আমি খুব খুশি হয়েছি আমাকে এই পুরস্কারটা দেওয়া হয়েছে। এটাই বোধহয় শেষ পুরস্কার।’
আব্দুস সাদেক আবাহনীর প্রথম অধিনায়ক। আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামালের সঙ্গে আব্দুস সাদেকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।’ শেখ কামাল নিহত হওয়ার পর আবাহনী সংকটে ছিল। তখন আবাহনীকে টিকিয়ে রাখার জন্য যারা চেষ্টা করেছিলেন তাদের মধ্যে একজন সাদেক।
‘অনেক বছর ধরে আমি হকিতে কাজ করছি। ইনজুরির কারণে আর খেলাটা হয়নি। ৮৪ সালে ব্যথা পেয়েছিলাম, ১৩টা সেলাই পড়েছিল চোখে। খেলাটাই ছাড়তে হয়েছিল সেদিন। সেই চোখেই কাল পানি ঝরল পদক হাতে, আবেগে। ইনজুরির কারণে আর ক্যারিয়ার এগোয়নি। কিন্তু হকি নিয়ে লক্ষ্য ছিল নিজে যদি জাতীয় হকি দলে খেলতে না পারেন খেলোয়াড় তৈরি করবেন। নিজ এলাকায় ছোটদের প্রশিক্ষণ দিতে দিতে হকি অঙ্গনে হয়ে গেলেন ফজলু ওস্তাদ। খেলোয়ার তৈরির কারিগর ফজলুল ইসলাম।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে সাফল্য বয়ে আনা আরচারি এবার ফেডারেশন কোটায় পুরস্কার পেয়েছে। এই খেলাটা শুরু হওয়ার পর থেকে স্বর্ণ, রুপা এবং ব্রোঞ্জ মিলিয়ে ১৪০টা পদক জয় করেছে আরচারি ফেডারেশন। এস এ গেমস আরচারিতে ১০টা স্বর্ণ পদকের মধ্যে ১০টাই তুলে এনেছিল আরচারি।
আরচারি খেলাটা জাতীয়ভাবে বাংলাদেশে শুরু করেছিলেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল। তিনি আগেই রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছিলেন। গতকাল তিনি ফেডারেশনের পুরস্কার গ্রহণ করে কষ্টের কথা তুলে আনলেন। ‘এই খেলাটা চালু করতে গিয়ে অনেক কটুকথা শুনতে হয়েছে। আমি নতুন দোকান খুলেছি। খেলাটা নিয়ে ব্যাঙ্গ করা হতো-সংবাদমাধ্যমকে বললেন চপল।
১০ জনের মধ্যে হকিতেই তিন জন শেখ কামাল জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন। ড্র্যাগ অ্যান্ড ফ্লিক স্পেশালিস্ট হয়ে উঠছেন হকির আমিরুল ইসলাম, উদীয়মান এই খেলোয়াড় এবার শেখ কামাল ক্রীড়া পুরস্কার পাবেন এটা যেন নিজেও ভাবেননি। খুব বেশি দিন হয়নি যিনি ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। তার জন্য শেখ কামাল ক্রীড়া পুরস্কার অনেক বড় প্রাপ্তি। জীবনে এত বড় প্রাপ্তি কল্পনাও করেননি আমিরুল ইসলাম। বললেন, ‘এই পুরস্কার আমাকে এগিয়ে নেবে।’
এবারই প্রথম ধারাভাষ্যকার হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন সাবেক ক্রিকেটার আতাহার আলী খান। বলছিলেন, ‘খেলার মাঠেও তিনি ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে খেলার যুদ্ধই করেন।’
সাংবাদিকতায় পুরস্কার পেয়েছেন ফটো সাংবাদিক খন্দকার তারেক। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সম্মুখ যুদ্ধে প্রাণ নিয়ে ঘরে ফেরা সেই মানুষটি পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে না গিয়ে খেলার মাঠে ছুটেছিলেন। অর্থের দিকে না তাকিয়ে খেলার মাঠের ছবি তুলে দেশের খেলাটাকে ফ্রেমে বাঁধিয়েছিলেন খন্দকার তারেক। ব্যাডমিন্টনের সাবেক তারকা মরিয়ম তারেককে জীবনসঙ্গিনী করেছেন তিনি। এই দম্পতির ঘরে রয়েছে তিন সন্তান। নিভৃতে চলা এই মানুষটি ৫০ বছর সাংবাদিকতা করছেন। তার অবদানস্বরূপ শেখ কামাল জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন খন্দকার তারেক।
পুরস্কার পেলেন যারা: আবদুস সাদেক (আজীবন সম্মাননা)। নারী ফুটবলে সাবিনা খাতুন, ক্রিকেটে তাসকিন আহমেদ, ভারত্তোলনে জিয়ারুল ইসলাম, উদীয়মান খেলোয়াড় মুহতাসিন আহমেদ হূদয়, সাঁতারে আমিরুল ইসলাম, ফুটবলে ময়মনসিংহের মালা রাণী সরকার, হকিতে ফজলুল ইসলাম, সংগঠন বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন, ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), ক্রীড়া সাংবাদিকতায় মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার তারেক মো. নুরুল্লাহ, ধারাভাষ্যে আতাহার আলী খান।