রাঙ্গামাটিতে ভারী বর্ষণে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল, পাহাড় ধসের শঙ্কা

অব্যাহত ভারী বর্ষণে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন স্থানে মাটি ধসে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও স্বাভাবিক যান চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ।  টানা বর্ষণের ফলে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধস ও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

এদিকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় এসব উপজেলার অন্যান্য এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। এসব উপজেলাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রিতদের শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

এছাড়া রাঙ্গামাটিতে চলমান অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি এবং করনীয় নির্ধারণে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের জরুরি সভা করা হয়েছে। সভায় জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সচল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

11

এদিকে, রাঙ্গামাটি কাপ্তাই উপজেলায় কিছু কিছু এলাকায় মাটি ধসে কয়েকটি বসতঘর ধসে পড়েছে। রাইখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এসএম নাছির উদ্দীন বলেন, রাইখালী রিফিউজি পাড়া, বড় ঝিরিপাড়া ও রাইখালী বাজার এলাকায় পাহাড় ধসে টিুট, ভট্ট, জাহাঙ্গীর আলম, আজিম, আবদুর রশীদ, হারুন ও নেজামের ৮টি ঘর পাহাড় ধসে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। বড়ইছড়ি কাপ্তাই ক্লাবের পাশের অনিল তঞ্চ্যঙ্গা ও চিৎমরম সিড়িঁঘাট এলাকার আরও ২টি ঘর বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি ইউপি চেয়ারম্যানকে অবগত করা হয়েছে।

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মহিউদ্দিন বলেন, রাইখালীর ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের খবর পেয়েছি। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

13

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুমানা আক্তার বলেন, বাঘাইছড়িতে টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আশা পাহাড়ি ঢলে বাঘাইছড়ি উপজেলার কাঁচালং নদীর পানি বেড়ে এরই মধ্যে নিচু অঞ্চল সমূহ প্লাবিত হতে শুরু করেছে। উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের করেঙ্গাতলী সড়ক ও পৌর এলাকার উগলছড়ি সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের উগলছড়ি, বেপারী পাড়া, নিউলাইল্ল্যা ঘোনা এবং পৌরসভার বটতলী, মাদ্রাসা পাড়া, হাজী পাড়ার কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। ভারী বর্ষণের ফলে মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কে দুইটিলা এলাকায় দুইবার পাহাড় ধসের ঘটনায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সড়ক জনপদ বিভাগ প্রায়  ২ ঘণ্টার চেষ্টায় যান চলাচল স্বাভাবিক করে তোলে।

এছাড়া বন্যার আশঙ্কায় উপজেলা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া আনসার ভিডিপির সদস্যদের উদ্ধার কাজে মাঠে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, জুরাছড়ি উপজেলা টানা ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আউশ মৌসুমে ২০২ হেক্টর জমির রোপিত ধান ও প্রায় ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

জুরাছড়ির দুমদুম্যা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাধন কুমার চাকমা বলেন,  পাহাড়ি ঢলে বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা আতংকে রয়েছে।

জুরাছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুরেশ কুমার চাকমা বলেন, উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তায় তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির এড়াতে পুলিশ ও উপজেলা পরিষদের একটি টিম মাঠে কাজ করছে।

অন্যদিকে, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকা রাজস্থলীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজস্থলী উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া যাওয়ার রাস্তার বেইলি ব্রিজটি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। তবে অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ের নিজস্ব বসবাসরতদের নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে সরাতে এবং সতর্ক করতে উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করছে উপজেলা প্রশাসন।

বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আদোমং মারমা বলেন, বাঙ্গালহালিয়া ডাকবাংলা পাড়ায় কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে বাঙ্গালহালিয়া বাজারসহ দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে বড় ধরনের কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন খান বলেন, একটি প্রাণও যেন ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে তার জন্য বৃষ্টির মধ্যে সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে প্রশাসন উদ্ধার তৎপরতায় মাঠে কাজ করছে। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব উপজেলায় ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটি শহর ও উপজেলায় মোট ১৮২ আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিতদের জন্য খাবার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ১৩ জুন রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনায় ৫ সেনাসদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর পরের বছর ২০১৮ সালে জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ১২ জুন পাহাড় ধসে আরও ১১ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এ বছর যেন সে দিনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।