বঙ্গমাতা: সংগ্রামে প্রেরণায় এক অবিস্মরণীয় মানুষ

বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার স্ত্রীর অপরিসীম অবদান ছিল। তিনি বঙ্গমাতার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং তার পরামর্শ গ্রহণ করতেন। যেটি বঙ্গবন্ধু নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন ‘রেণু আমার পাশে না থাকলে, আমার সব দুঃখ-কষ্ট অভাব-অনটন, বারবার কারাবরণ, ছেলে মেয়ে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন হাসিমুখে মেনে নিতে না পারলে আমি আজ বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না।’ বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনী ও লেখনীতে রেণু নামেই অসংখ্য বার সম্বোধন করেছেন তাকে।

বঙ্গমাতা অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও ১৯৪৬ সালে স্বামীকে দাঙ্গা উপদ্রুত বিহার এলাকায় কাজ করতে যেতে উত্সাহ দিয়েছেন। তার চিন্তায়-চেতনায় বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, আদর্শ ও কাজকে সমর্থন করেছেন। স্বভাবতই নিজের স্বার্থত্যাগ করে দেশের স্বার্থ ও মানুষের স্বার্থ তার কাছে অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। দুই বার মন্ত্রী হওয়ার পরও ঢাকায় নিজ পরিবারের কোনো বাড়ি বা বাসস্থান ছিল না। স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার ১৯৫৮ সালে মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হলে অনেকেই তখন পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকারের ভয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিতে চান নাই।

বঙ্গবন্ধু আন্দোলন-সংগ্রামে নিয়োজিত থাকায় দীর্ঘসময় তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে। সেই দুর্যোগ আর দুর্দিনে বঙ্গমাতা অসীম সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে পরিবার ও রাজনীতির হাল ধরেছেন। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালীন বঙ্গমাতা প্রয়োজনীয় পরামর্শ, আর্থিক এবং বিভিন্ন সহায়তা ও সাহস দিয়ে আন্দোলন ও সংগ্রামে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতেন। আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬০ সালে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। বঙ্গমাতা বাড়ি নির্মাণ কাজে প্রত্যক্ষভাবে নির্মাণকাজ তদারক করতেন। এ সময় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের চোখ এড়াতে নেতাকর্মীরা শ্রমিকের ছদ্মবেশে বাড়িতে যেত। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কর্মীদের মাধ্যমে নেতাদের কাছে পাঠানো হতো। এভাবেই বঙ্গমাতা দেশ ও জাতির প্রয়োজনে আন্দোলন ও সংগ্রামে গেরিলা হয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য দিকনির্দেশনা পাঠাতেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ভাষণে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতি হবে, পৃথিবীতে আর কেউ না জানলেও আমার মা যে জানতেন, সেটা এখন যখন সমস্ত পেছনের জিনিসগুলো চিন্তা করি, তখন মনে হয় আমার মা তো সবই জানতেন।’

বঙ্গবন্ধুর ৫৪ বছরের জীবনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় কারাবন্দি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা আন্দোলনের পক্ষে জেলায় জেলায় উদ্বুদ্ধ করায় বারবার কারাবন্দি হন। বঙ্গমাতা দৃঢ়তার সঙ্গে ছয় দফার পক্ষে অবস্থান নেন এবং দেশব্যাপী ছয় দফার আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। তীব্র আন্দোলনের মুখে সে সময়ের সরকার ভয় পেয়ে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গমাতা প্যারোলের বিপক্ষে অটল থাকেন। প্যারোলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার বার্তাটি বঙ্গমাতা বড় মেয়ে শেখ হাসিনাকে দিয়ে কারাগারে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুও প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে বঙ্গমাতার এসব অবদানকে বঙ্গবন্ধুও স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘আমার সংগ্রামী রেণু সেই কোন ছোটবেলা থেকে আমার সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রাম করে চলেছে। সে আজ মিশে গেছে জনতার সঙ্গে। এভাবে মিশে যাওয়ার জন্যই তো রেণু তার সারাটা জীবন উত্সর্গ করেছে। রেণু তো আজ মাত্র পাঁচটি সন্তানের জননী নয়, রেণু আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ সন্তানের জননী’ (আনোয়ারা সৈয়দ হক, আমার রেণু, পৃষ্ঠা ১৬৮)।

বঙ্গবন্ধু ইচ্ছা করলেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা হননি। অন্য কোনো স্ত্রী হলে স্বামীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করত। কিন্তু বঙ্গমাতা দ্বিমত পোষণ করেননি। জাতির পিতা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গমাতা অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। এমনকি ফার্স্ট লেডির পদ গ্রহণ বা ভূমিকা রাখেননি। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।

ব্যক্তিজীবনে বঙ্গমাতা যে কতটা সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, তা আমি নিজ চোখে দেখেছি। তিনি নিজে তরকারি কাটা, রান্না করা, নেতাকর্মীদের চা পরিবেশন করতেন। এক প্যাঁচে সাধারণ শাড়ি পরতেন। তিনি সাধারণের মধ্যেও অসাধারণ ও অনন্য ছিলেন। তার ব্যক্তিত্বের অসাধারণ ও অনন্য গুণাবলি খুব কাছ থেকে বহুবার দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাজে প্রায়ই ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতাম। বহু রাজনৈতিক কর্মী তার স্নেহ ও মমতা লাভ করেছেন। আমিও তার স্নেহ ও মমতা থেকে বঞ্চিত হইনি। এ প্রসঙ্গে বঙ্গমাতার সঙ্গে আমার চিরস্মরণীয় স্মৃতি রয়েছে। ১৯৭৪ সনে আমি ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস, ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলাম। সে সময়ে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সম্মেলনে কমিটি ঘোষণায় ঐকমত্য হতে পারে নাই। ফলে মন খারাপ করে আমরা কয়েক জন টিএসসির মাঠে বসেছিলাম। তিনি হয়তো আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গমাতা আমাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসায় যাওয়ার জন্য লোক পাঠিয়েছেন। তখন ঢাকা মহানগরীর ছাত্রলীগের মহিলা সংগঠনের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী আমার মতো একজন ক্ষুদ্র কর্মীকে যেতে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র কামাল ভাই যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন। ভয়ে ভয়ে আমি ও কয়েক জন কর্মীসহ বাসায় গেলাম। দরজা খুলতেই দেখি বঙ্গমাতাকে। আমি পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ভয়ে ভয়ে বললাম আপনি আমাকে আসতে বলেছেন। বঙ্গমাতা বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমরা তো এখনো খাওনি, মুখটা তো শুকিয়ে গেছে। হাত মুখ ধুয়ে আগে খেয়ে নাও, পরে কথা হবে।’ আমাদেরকে খাবার টেবিলে বসালেন। তিনি নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করলেন। আমি ভয়মুক্ত হলাম। আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, একজন জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী অথচ এত নিরহংকারী, আন্তরিক, অমায়িক, ভদ্র, নম্র, অতিথিপরায়ণ ও কর্মীবান্ধব, যা শুধু মনের গভীরতা দিয়েই অনুভব করা যায়, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৯ শতাংশ এবং অনুন্নত বাংলাদেশ স্বল্পন্নোত দেশের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। ছোট শিশুপুত্র রাসেলসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গমাতাকে খুনিরা বলেছিল, ‘আপনি চলেন’। তিনি বললেন, ‘কোথাও যাব না। ওনাকে খুন করেছ, আমাকেও শেষ করে দাও। আমি এখান থেকে এক পাও নড়ব না।’ কিন্তু বঙ্গমাতা খুনিদের কাছে জীবন ভিক্ষা চাননি।

বঙ্গবন্ধুই এ দেশে প্রথম নারীর ক্ষমতায়নের পথপ্রদর্শক। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন নীতি, আইন ও অগ্রগতিশীল কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছেন। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল সৃষ্টি করেছে। সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে শীর্ষে। অনেক উন্নত-সমৃদ্ধ দেশও বাংলাদেশের পেছনে।

মহীয়সী বঙ্গমাতার অবদানকে চিরস্মরণীয় করার লক্ষ্যে সরকার ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচ জন বিশিষ্ট নারীকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব পদক প্রদান করছে। এ বছর চার জন বিশিষ্ট নারী ও একটি প্রতিষ্ঠানকে পদক প্রদান করা হচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করা হচ্ছে। ফলে সর্বস্তরের মানুষ মহীয়সী এ নারীর ত্যাগের মহিমা জানতে পারছে। আমি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯৩তম জন্মবার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমি একই সঙ্গে প্রস্তাব করছি, বঙ্গমাতার গৌরবময় কর্মজীবন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং গবেষণার মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য জীবনের অজানা তথ্যগুলো নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হোক।

লেখক: প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়