কক্সবাজারে বন্যা: কমেছে পানি, বেড়েছে দুর্ভোগ

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় জমা পানি কিছুটা নেমেছে। তবে, দুর্ভোগ কমেনি জেলার ৬০টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ বানভাসি মানুষের। বানের জলে সবকিছু ডুবে থাকায় পরিবারের সদস্যরা চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় রয়েছেন চকরিয়া-পেকুয়ার ২৫টি ইউনিয়নের জলবন্দি লাখো মানুষ।

জলমগ্ন মানুষগুলো বিশুদ্ধ পানি সংকটে মানবেতর সময় পার করছেন। গবাদি পশু ও আসবাবপত্র নিয়ে মহাসড়ক, বাঁধ, ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো সহসা বাড়ি ফিরতে পারছে না; পানি পুরো নেমে গেলেও সহসা বিড়ম্বনা পিছু ছাড়বে না পানিবন্দিদের, এমন অভিমত ভুক্তভোগীদের।

ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে, চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া বানের পানি বুধবার সকালে কিছুটা কমলেও শুরু হয়নি কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়কে যান চলাচল। তবে, ছোট ও মাঝারি যানবাহনে আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে যাতায়ত করছে বলে জানিয়েছেন সৌদিয়া পরিবহনের কক্সবাজারস্থ ব্যবস্থাপক নিরু পাল। 

পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া এলাকা এখনো জলমগ্নতা না কমলেও মহাসড়কের অন্য স্থানের পানি পুরোপুরি নেমে গেছে বলে জানিয়েছেন চিরিংঙ্গা হাইওয়ে থানার ইনচার্জ (ভারপ্রাপ্ত) এসআই খোকন রুদ্র। এরপরও চট্টগ্রামের মতো বান্দরবানের সঙ্গেও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানায়, মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) রাতে বৃষ্টি কম হওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করে। তবে ভাটির দিকে এখনও নতুন নতুন এলাকায় পাহাড়ি ঢুকছে বলে জানিয়েছেন দুর্গতরা। নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢলের পানি ঢুকে পড়ছে এসব গ্রামে।

ছবি: ইত্তেফাক

চকরিয়ার কাকারায় বানের পানিতে ঘর ডুবে যাওয়ায় গবাদিপশু ও পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে মহাসড়কে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবন্ধী আব্দুল হামিদ। গত দুদিনেও কোনো ধরনের সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঘরের ছাউনি পর্যন্ত পানি উঠায় ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে জীবন বাঁচাতে বাঁধে ঠাই নিয়েছি। সন্তানদের খাবার দিতে পারছি না, সঙ্গে অবলা গবাদিপশুগুলোও অভুক্ত।

শুধু আব্দুল হামিদ নন, বানের পানিতে খাদ্য সংকটে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন চকরিয়া-পেকুয়ার বানভাসি মানুষ।

চকরিয়ার ইউএনও জেপি দেওয়ান বলেন, মঙ্গলবার বিকালে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন। চকরিয়ায় ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুকনা খাবারের পাশাপাশি চাল বিতরণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত চকরিয়ায় পাহাড় ধসে দুজন ও পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

সড়কে এসে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। ছবি: ইত্তেফাক

অন্যদিকে পেকুয়ার ১০-১২টি গ্রাম থেকে পানি কমছে। তবে আরও ডজনাধিক গ্রামে পানি বাড়ছে। যেসব বসতঘরে হাঁটুসমান পানি ছিল। সেসব বসত ঘরে বুক সমান পানি হচ্ছে। বিশেষ করে পেকুয়া সদরের গোঁয়াখালী, বকসু চৌকিদারপাড়া, ছিরাদিয়া, বিলহাচুরা, শেখের কিল্লাহ ঘোনা, সিকদারপাড়া, বাইম্যাখালী, জালিয়াখালী, নন্দীরপাড়া, বাঘগুজারা এলাকায় পানি বাড়ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, উঁচুস্থান থেকে পানি নিচু স্থানে নেমে আসছে। এ জন্য পানির পরিমাণ বাড়ছে। তবে ছিরাছিয়া ও গোঁয়াখালী এলাকায় বেড়িবাঁধ কেটে দিয়ে পানি কাটাফাঁড়ি খালে বের হচ্ছে। খালে লোকালয়ের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি কম আছে। এ জন্য লোকালয় থেকে পানি দ্রুত বের হচ্ছে। বৃষ্টি না হলে বুধবার রাতের মধ্যে পানি তিন থেকে চার ফুট কমে যাবে।

পেকুয়ার ইউএনও পূর্বিতা চাকমা নৌকা নিয়ে প্লাবিত এলাকায় গিয়ে শুকনা খাবার, চাল-ডাল ও রান্না করা খাবার বিতরণ করছেন। মঙ্গলবার বিকালে স্থানীয় এমপি জাফর আলম, জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান, পেকুয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ দিয়েছেন।

ছবি: ইত্তেফাক

ইউএনও বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ পাওয়া ১৫ টন চাল আশ্রয়কেন্দ্র ও পানিবন্দী লোকজনের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পেকুয়ায় সাপের কামড়ে এক ব্যবসায়ী ছাড়া আর কোনো মৃত্যু নেই।

রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির ইউনিয়নের পশ্চিম উমখালী গ্রামের শাহাদত হোসাইন বলেন, গেলো ২ দিন ধরে ঘরের ভেতর প্রায় কোমর সমান পানি, তাই রান্না চুলা জ্বলেনি। খাটের ওপর কোনো রকমে বসবাস করছি। বাইরে থেকে শুকনো খাবার কিনে এনে খাচ্ছি। খাবার পানির সংকটও প্রকট।

সূত্র জানায়, পাহাড়ি ঢলের তোড়ে মাতামুহুরি নদীর কমপক্ষে ১৫টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এসব ভাঙন দিয়ে লোকালয়ে ঢলের পানি ঢুকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। মাতামুহুরি নদীর অববাহিকার বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। গত আট দিনে পাহাড় ধসে, পানিতে ভেসে ও সাপের কামড়ে চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আট জন মারা গেছে।

ছবি: ইত্তেফাক

চকরিয়া-পেকুয়াসহ বন্যাকবলিত এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছিল। পানি কমলেও এখনও তারা বাড়ি ফিরতে পারছেন না।

চকরিয়া পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেত্রী ফরহানা ইয়াসছিন তার ভেরিফাইড ফেইসবুকে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের কয়েকটি ছবি পোস্ট করে যথাযথ বরাদ্দ না থাকায় তাদের পাশে দাঁড়াতে পারছেন বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।

কক্সবাজার সদরের ঝিলংজার পূর্ব মুক্তারকুলের জাহেদা বেগম বলেন, নলকূপগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি না। কলাগাছের ভেলায় চড়ে চলাফেরা করছি।

ঝিলংজার চান্দের পাড়ার পানিবন্দি কৃষক নবী হোসেন বলেন, বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। একদিকে পাহাড়ি ঢলের পানি, অন্যদিকে বৃষ্টি। এ অবস্থায় বাড়ি-ঘর ছেড়ে মহাসড়কে আশ্রয় নিলেও খাবার এবং বিশুদ্ধ পানি সংকটে ভোগছি। এত বেশি বিত্তবান নয় যে, নিয়মিত বোতলজাত পানি কিনে পান করবো।

ছবি: ইত্তেফাক

রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দোছড়ি এলাকার আবছার উদ্দিন বলেন, টানা বৃষ্টির পানি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে বাঁকখালীর পানি বেড়ে যায়। নিমেষেই তলিয়ে যায় এলাকার শত শত গ্রাম। রক্ষা করা যায়নি বসতভিটা, জমির ফসল ও শত শত একর পুকুরের মাছ। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কমেনি। সরকারিভাবে যেটুকু সহযোগিতা করা হচ্ছে, তা অপর্যাপ্ত।

ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান টিপু সুলতান জানান, বানভাসি মানুষের বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন জরুরি হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি মেরামতসহ আর্থিক সহায়তার একান্ত দরকার।

জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানান, বন্যায় চকরিয়া-পেকুয়ার সব ইউনিয়ন কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষে ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় ৫৮ মেট্রিক টন চাল এবং সাত লাখ নগদ টাকা সাহায্য দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দূর্গতদের জন্য বিতরণ হচ্ছে শুকনো খাবারও। বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার অভিযান ও খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।