পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে খ্যাত আমাজন বনের সমৃদ্ধ বৃক্ষরাজি পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের ২০ শতাংশ তৈরিতে ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাসের মধ্যে অন্যতম ‘কার্বন ডাইঅক্সাইড’ গ্যাসটিকে বাতাস হইতে বিপুল পরিমাণে গ্রহণ করে এই আমাজন বন। কোনো মানুষের ফুসফুসের ২০ শতাংশ ক্ষতি হইলে যেমন জীবনসংশয়ের অবস্থা তৈরি হয়, তেমনিভাবে আমাজন বন ক্রমশ বিপন্নতার মুখে পড়িয়া থাকিলে তাহা সমগ্র পৃথিবীর জন্যই বিপজ্জনক। এই আমাজন বনটিকে বাঁচাইতে সম্প্রতি ঐ বনের অংশীদার আটটি দেশের প্রতিনিধিরা দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হইয়াছিলেন। গত মঙ্গলবার ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া আমাজন অববাহিকার অংশীদার আট দেশ—ব্রাজিল, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গায়ানা, পেরু, সুরিনাম ও ভেনেজুয়েলা একটি বিষয়ে একমত হইয়াছেন—আমাজনকে বাঁচাইতে হইবে। শীর্ষ সম্মেলনে ‘বেলেম ঘোষণা’ নামে একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হইয়াছে—আমাজন বন উজাড়ের বিরুদ্ধে তাহারা সম্মিলিতভাবে লড়াই করিবেন। ‘আমাজন কো-অপারেশন ট্রিটি অর্গানাইজেশন’-এর বৈঠকের যৌথ ঘোষণাপত্রে প্রায় ১০ হাজার শব্দের একটা রোডম্যাপ তৈরি করা হইয়াছে, সেইখানে বলা হইয়াছে কী করিয়া এই বিশাল বনভূমিকে সংরক্ষণ করা হইবে। এই দেশগুলি একীভূত পরিবেশনীতির একটি তালিকার বিষয়েও সম্মত হইয়াছে। সকল কিছু শেষ হইয়া যাইবার পূর্বেই তাহারা এখনই ব্যবস্থা লইতে চাহেন। তাই উন্নত দেশগুলির নিকটও আবেদন জানাইয়াছে এই আট দেশের জোট। তাহারা বলিয়াছে—বিশ্বের সর্ববৃহত্ এই রেইনফরেস্টটিকে বাঁচাইবার দায় শুধু এই আটটি দেশের নহে।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই শীর্ষ বৈঠকের উপর গোটা বিশ্বের নজর ছিল। মনে রাখিতে হইবে, আমাজনে অববাহিকার প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার জায়গার মধ্যে ৫৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকাই আমাজনের দখলে। আমাজন বন এতটাই বড় যে, যুক্তরাজ্য এবং আয়ারল্যান্ডের মতো ১৭টি দেশ আমাজনের মধ্যে ঢুকিয়া যাইবে। এই বনের জীবনীশক্তি হইল আমাজন নদী—যাহা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। প্রায় ১১ শতাধিক উপনদী লইয়া আমাজন নদী গঠিত, যাহার মধ্যে ১৭টি নদীর দৈর্ঘ্য হাজার মাইলের বেশি। আকারের বিশালতার মতোই আমাজনের প্রাণিকুল এবং উদ্ভিদকুলের মধ্যেও প্রায় ৪০ হাজার প্রজাতির গাছ, প্রায় তেরো শত প্রজাতির পাখি, সোয়া ২ হাজার জাতের মাছ, সোয়া চার শত জাতের স্তন্যপায়ী, পৌনে চার শত জাতের সরীসৃপ, সোয়া চার শত জাতের উভচর প্রাণী এবং ২৫ লক্ষ জাতের পোকামাকড় রহিয়াছে। গাছপালা ও জীবজন্তু ছাড়াও আমাজন বনে প্রায় পাঁচ শতাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। ধারণা করা হয়, ইহাদের মধ্যে প্রায় ৫০টি আদিবাসী গোষ্ঠীর সহিত বাহিরে পৃথিবীর কোনো সম্পর্ক নাই। লক্ষণীয় বিষয় হইল, কমপক্ষে সাড়ে ৫ কোটি বত্সর ধরিয়া আমাজন বনের অস্তিত্ব বিরাজমান। সুতরাং যেই সংকট বর্তমানে, গত কয়েক শতকের ব্যবধানে সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার মনুষ্যসৃষ্ট। আমাজনকে বাঁচাইবার এই শীর্ষ বৈঠকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভার কথাটি ছিল অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। তিনি বলিয়াছেন—‘ইতিপূর্বে আমাজন বাঁচাইবার বিষয়টি এতটা জরুরি ছিল না। কিন্তু গত জুলাই ছিল বিশ্বের উষ্ণতম মাস। এখন আমাদের একসঙ্গে কাজ করিতেই হইবে। নচেত্ আমরা নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইব।’
প্রকৃতপক্ষে, উষ্ণতম দিনের রেকর্ড এই বিশ্ব প্রতি বত্সরই ভাঙিতেছে। অনেকগুলি অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের দাবানলের কথাও উল্লেখ করিতে হয়। গতকাল পর্যন্ত ঐ দাবানলে ৫৫ জন মানুষের মৃত্যু ঘটিয়াছে। ইহা যেন এক নূতন পৃথিবী! এই জন্য বর্তমানে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করিবার বিষয়টিকে এই ধরিত্রীর বুকে মানুষের বাঁচা-মরার সহিত তুলনা করা হইতেছে। নিজ নিজ ক্ষেত্র হইতে পৃথিবীকে রক্ষার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জরুরি এবং প্রশংসনীয়। আমাদের তো একটাই পৃথিবী। পৃথিবী রক্ষার মহাদায়িত্ব সকলেরই। নিজ নিজ পরিসর হইতে সেই চেষ্টা প্রতিটি রাষ্ট্রকে করিতে হইবে।