গত ১৯ জুলাই বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সন্ধ্যা ৭টার খবর পড়ছিল এক কৃত্রিম মানবী; নাম অপরাজিতা। কৃত্রিম উপস্থাপিকার সংবাদ উপস্থাপন। কর্মজীবী মানুষের সমান্তরালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টোলিজেন্স—এআই-এর থাবা আর্শীবাদ না বিপত্তি তা অনেকের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যার দেশে এই এআই সংযুক্তি কিছুটা ঝুঁকি বলেই মনে করছেন।
আমেরিকান কম্পিউটারবিজ্ঞানী জন ম্যাকার্থি ১৯৮০ সালের শুরুতে আর্টিফিসিয়াল ইনন্টোলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। এআই রোবটদের অনন্যসাধারণ বুদ্ধিমত্তার কৌশলী-প্রতিভা দেখিয়েছে গত ৭ জুলাই জেনেভায়। নয়টি বিশেষ রোবট তাদের কর্মপরিধি, কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্ববোধের বিরল পরিচয় দিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রযুক্তিবিশ্বের ইতিহাসে পৃথিবীতে এই প্রথম রোবট সংবাদ সম্মেলন। বিশেষায়িত নয়টি বিশেষ ক্ষেত্রের জন্য কর্মপোযোগী নয় ধরন ও মানের রোবট-কৌতূহলী বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এবং মতামত তুলে ধরেছে। মিথ্যা প্রপাগান্ডার উত্তরে বলেছে তারা বৈশ্বিকভাবে বিস্ময়কর অবস্থানে থাকলেও কোনো ব্যক্তিবিশেষের চাকরিতে হস্তক্ষেপ করবে না। অনর্থক মিথ্যা অজুহাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করবে না।
সংবাদ সম্মেলনের আগে জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয় ‘এআই ফর গ্লোবাল সামিট’। নানাধরনের কটুবাক্য উপেক্ষা করে এআই কী করে বিশ্বের সাম্প্রতিক সময়ের চ্যালেঞ্জগুলিতে ছায়ার মতো কাজ করে যেতে পারে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। এখানে রোবটের কর্মপন্থার বিরুদ্ধে যেন শত্রু সৃষ্টি না হয়ে যায় তা নিয়েও চমকপ্রদ আলোচনা চলেছে। কেউ যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে উস্কানি-উত্তেজনা সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখার কথা বলা হয়েছে।
রোবট প্রযুক্তির যে অভাবিত উত্কর্ষ-উন্নতি—এর অন্তরালে কাজ করছে একটি সুদক্ষ-সুশিক্ষিত জনশক্তি। এই প্রযুক্তিকে মান্যজ্ঞান করে আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুনির্দিষ্টভাবে রোবোটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকোর্স চালু করা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে কুয়েট এবং চুয়েটের রোবোটিক বিভাগ ইতিমধ্যে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এই বিষয়ে দক্ষ জনশক্তির নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে বাংলাদেশের টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, লজিস্টিকস, ওয়্যারহাউজিং, অটোমোটিভ, হেলথকেয়ারসহ কিছু সেবাখাতে এআই দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে। এর বাইরেও রোবোটিক প্রযুক্তির বিশেষ আনুকুল্য লাভ করে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, কনস্ট্রাকশন, প্লাস্টিক, প্যাকেজিং, ডিফেন্স, সিকিউরিটি, ফার্নিচারশিল্প।
বিবিএসের তথ্যমতে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত কাজে ব্যবহারের জন্য ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩ টি রোবট আমদানি করেছে। সংখ্যার বিচারে তা একেবারে সামান্য নয়। গৌরবের বিষয়, একই অর্থ বছরে বাংলাদেশও ১ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টি রোবট চীনে রফতানি করেছে। দেশের জনসংখ্যাতত্ত্বে এই সংখ্যা হয়তো নগণ্য। তবে তা ক্রমবর্ধমান। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটের প্রতিবেদনে জানা যায়, সারা বিশ্বে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটের চাহিদার মূল্যমান ১৬৭৮ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ৩৫৬৮ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। বিশাল এই বাজারের কিয়দাংশ নিজেদের আয়ত্তে আনতে পারলেই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ পালটে যাবে।
তরুণ-যুবদের এই কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য চাই সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল। এআই খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে মনোনিবেশ করতে হবে। চুয়েটে প্রতিষ্ঠিত শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর, প্রস্তাবিত ৩২ জেলায় আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন, মাদারীপুরের কুতুবপুরে শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার ও সফটওয়্যার টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে তরুণ-যুব ও সাধারণ জনগণকে আইটি বিষয়ে উত্সাহী-আগ্রহী করতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য অর্জন প্রযুক্তি উত্কর্ষের মাধ্যমেই সম্ভব। গতানুগতিক শিক্ষাকে পাশে রেখে পেশাদারিত্বের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে বিচ্ছিন্ন-নিঃসঙ্গ এআই রিলেটেড কর্মীদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-প্রযুক্তি সহায়তার মাধ্যমে আরো দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।
মফস্সল শহর, পাড়াগাঁ পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে হাই-টেক ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা। তবেই তো প্রযুক্তির সঙ্গে কায়িকশ্রমের সমন্বয় ঘটবে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে উঠবে মানবতার কল্যাণে।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।