বিশ্ব হাতি দিবস 

বিলুপ্তির পথে বন্যহাতি

মহাবিপন্ন প্রাণী বন্যহাতির অস্তিত্ব রক্ষায় বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আজ (১২ আগস্ট) শনিবার পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হলেও হাতি রক্ষায় বিশেষ কোনো কার্যক্রম নেই। অবাধে বনভূমি উজাড়ের ফলে খাদ্য, আবাসস্থল ও বিচরণ ক্ষেত্র ধ্বংস, শিকারিদের নিষ্ঠুরতা প্রভৃতি কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অমূল্য সম্পদ হাতি। বন বিভাগ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ক বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০১৫ সালে পরিচালিত জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে হাতি ছিল ২৭৯ থেকে ৩২৭টি। তন্মধ্যে স্থানীয় হাতি ২৯৬ থেকে ২২৭টি এবং ৮৩ থেকে ১০০টি মাইগ্রেটেড (ভারত ও মায়ানমার থেকে যাতায়াতকারী)। তবে এই সংখ্যা গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। শুধু ২০২১ সালেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩০টির বেশি হাতি মারা হয়েছে বলে গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে জানায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোট ‘বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট’। তারা বলছে, বাংলাদেশে বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২০০। হাতির আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া, হাতি চলাচলের পথে বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি হাতি সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ না নেওয়া হাতির সংখ্যা কমে আসার বড় কারণ মনে করা হয়। আইসিইউএনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বন বিভাগের চট্টগ্রামের দক্ষিণ অঞ্চলে হাতি আছে ৩০ থেকে ৩৫টি। কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ মিলিয়ে আছে ৮২ থেকে ৯৩টি। বান্দরবানে আছে ১২ থেকে ১৫টি এবং লামা বিভাগে আছে ৩৫ থেকে ৪০টি হাতি। বাংলাদেশে স্থায়ী বন্যহাতির আবাসস্থল হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ, বাঁশখালী, পটিয়া ও রাঙ্গুনিয়ায়, কক্সবাজার জেলার, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ, বান্দরবান জেলার লামা ও আলিকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী, কাপ্তাই ও লংগদু এবং খাগড়াছড়ি জেলাসহ দেশের ১১টি বন বিভাগে এদের বিচরণ করতে দেখা যায়। ৯০ দশকে খাগড়াছড়ির রামগড়ের বিভিন্ন স্থানে ২০-২৫ সদস্যের একটি হাতির পালের বিচরণ ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে দুটি হাতির মৃত্যু এবং বিষ টোপ দিয়ে একাধিক হাতিকে হত্যা করার ঘটনার পর হাতির পালটি অন্যত্র চলে যায়।

৮০-র দশকে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি তিন পার্বত্য জেলায় ৫ শতাধিক হাতি থাকলেও বর্তমানে এক থেকে দেড়শ তে নেমে এসেছে। বন বিভাগের তথ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট বনাঞ্চল ২৬ লাখ ৮৬ হাজার একর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৭ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫ একর। মোট বনভূমি ৩২ হাজার ২৫০ একর এবং সরকারি বনাঞ্চল (ইউসিএফ) ১৮ লাখ ৫৪ হাজার ২০০ একর। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এসব বনাঞ্চলের গাছ কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞা তেমন বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অব্যাহত বনাঞ্চল উজাড়ের কারণে খাদ্যসংকট, আবাসস্থল ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ধ্বংস এবং শিকারিদের হত্যার কারণে এ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে হাতির সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। বন উজাড়ের কারণে খাবারের খোঁজে হাতি চলে আসছে লোকালয়ে। হামলা চালাচ্ছে মানুষের বসতবাড়িতে, মারছে মানুষ। মানুষও বাঁচতে হাতির পালের ওপর হামলা চালাচ্ছে। একটি হাতির জন্য দৈনিক ২৫০ কেজি খাবার প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রতিদিন হাতির জন্য এত খাবারের পাওয়া খুবই কঠিন। হাতি বেশির ভাগ খেয়ে থাকে গাছপালা ও লতাপাতা। বন উজাড়ের কারণে হাতির খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত চট্টগ্রামের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ৪৩টি বুনো হাতির মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হাতির মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার দক্ষিণ ও উত্তর বন বিভাগে। সেখানে গুলি করে হাতি হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

আইইউসিএন ২০১৫-১৬ সালের জরিপে বাংলাদেশের ১২টি এলাকাকে হাতির করিডর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। করিডরগুলোর মধ্যে রয়েছে—কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনে তিনটি, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের অধীনে পাঁচটি এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনে চারটি। এগুলো হলো—উখিয়া-ঘুমধুম সীমান্ত, তুলাবাগান-পানেরছড়া, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি-রাজারকুল। ভ্রমরিয়াঘোনা-রাজঘাট, তুলাতলী-ঈদঘর, খুটাখালী-মেধাকচ্ছপিয়া, খাসিয়াখালী-সাইরুখালী ও সাইরুখালী-মানিকপুর। কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে এসব করিডরের বেশির ভাগেরই অস্তিত্ব নেই। বনবাদাড় উজাড়, হাতির চলাচলের পথে খেতখামার, বসতবাড়ি গড়ে উঠার কারণে বনের হাতি এখন লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে প্রাণহানিসহ ঘরবাড়ি, খেতখামারের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। হাতির হামলায় মানুষের প্রাণহানির সংখ্যাও কম নয়। ২০১৪-২০২৩ সাল পযর্ন্ত ৯ বছরে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাতেই হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন। এই সময়ের মধ্যে মানুষের হামলাসহ নানা কারণে ৩০টি হাতিও মারা গেছে। প্রাণহানির ঘটনার ফলে মানুষ ও হাতির মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এ দ্বন্দ্বের কারণেও হাতি হত্যার ঘটনা ঘটে। হাতির অস্তিত্ব রক্ষায় আইইউসিএন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। ১০ বছর মেয়াদি এই প্রকল্প শেষ হবে ২০২৫ সালে। মানুষ ও হাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাত কমাতে স্থানীয়দের নিয়ে এলিফেন্ট রেসপন্স টিম গঠন, হাতি লোকালয়ে চলে এলে কীভাবে তাকে পোষ মানিয়ে আবার বনে ফেরত পাঠানো যায় সে বিষয়ে রেসপন্স টিমের সদস্যদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কর্মশালা, লোকালয়ের সীমানা বরাবর হাতির অপছন্দনীয় খাদ্যের বাগান যেমন কাঁকরোল, করলা, মরিচ ইত্যাদির বাগান সৃজন, বনের মধ্যে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান সৃজন, চুনতির অভ্যন্তরে হাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় সোলার ফেন্সিং স্থাপন, হাতি চলাচলের রাস্তা নির্দেশক ও জনসচেতনতামূলক নির্দেশিকা বোর্ড স্থাপনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। বনের সীমানার অভ্যন্তরে হাতির খাদ্যোপযোগী বাগান সৃজন, চুনতির অভ্যন্তরে বড় হাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় সোলার ফেন্সিং নির্মাণ, হাতি চলাচলের রাস্তা নির্দেশক ও জনসচেতনতামূলক নির্দেশিকা বোর্ডসহ বিবিধ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। হাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিবৃত্ত করে হাতি সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত মানুষের জানমালের ক্ষতিপূরণ নীতিমালা ২০১০ নামে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। নীতিমালা অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ১ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা ও গবাদি পশু, ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসল ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করার বিধান রয়েছে। হাতির আবাসস্থল উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিতকরণ ও মানুষ হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ব্যাপক গণ-সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমেই বিলুপ্তির হাত থেকে অমূল্য সম্পদ হাতিকে রক্ষা করা যাবে বলে মনে করেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

লেখক: সাংবাদিক