ইত্যাদি: সমাজ সংস্কারের দিক-নির্দেশনা দেয় যে অনুষ্ঠান

‘ইত্যাদি’র নিয়মিত দর্শক হিসেবে খানিক বিলম্বেই দেখা হলো এবারের মুন্সিগঞ্জ পর্বটি। দেখতে চাইলাম দেশের সবচেয়ে শ্রমলব্দ, মননশীল কন্টেন্ট হিসেবে হানিফ সংকেতের উপস্থাপনায় এই তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের দম কতটুকু! কিন্তু এখনকার এত এত অশ্লীল আর ভাইরাল করার জোরপূর্বক দৌড়ে ইত্যাদির মতো নান্দনিক অনুষ্ঠানও যখন ১ সপ্তাহ পরেও ট্রেন্ডিংয়ে থাকে, এটা একটা দারুণ সংকেত বলতে হয়! কারণ এর অর্থ হলো-ভালোমানের অনুষ্ঠানের দর্শকও রয়েছে।

ঠিক এবারের ইত্যাদির লোকেশন, স্থান পরিচিতি ও ভূমিকা সংগীতের পরেই মূল পর্বে উপস্থাপক শোবিজের এই অশ্লীলতা-আঞ্চলিক ভাষার যথেচ্ছাচার নিয়ে দারুণ কিছু স্যাটায়ার করলেন। বিশেষ করে নতুন অভিনেতার অডিশনে যখন আঞ্চলিক ভাষা কতগুলো পারেন? জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল তখন মনে হলো বাস্তব অর্থেই তো আমরা যে যেই অঞ্চলের ভাষা পারি না তাকে দিয়ে ভুল-ভাল বলিয়ে এক ধরনের জোরপূর্বক হাসানোর অপেচষ্টা করি। একই সাথে কিছু নাটকে অহেতুক গালিগালাজ নিয়ে এখন অশ্লীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ইউটিউবভিত্তিক নাটকের অধিকাংশ এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে, যা এখন আর পরিবার নিয়ে দেখার কোনো পর্যায়ে নেই। এইসব স্থুল ও অশ্লীল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ওরফে নাট্য-নির্মাতারা আবার গলা উঁচিয়ে ভিউয়ের দম্ভ দেখিয়েই পুরো বিষয়টিকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন। ইত্যাদির প্রতিটি পর্বে একটি বিশেষ কোনো অসঙ্গতির ওপরে জোর দেওয়া হয়। এবারে শোবিজের এই অশ্লীল ভাইরাস নিয়ে বলার জন্য টিম ইত্যাদিকে ধন্যবাদ। খুবই সময়োপযোগী ছিল।

তবে আলাদা করে বলতে হয়-এবারের ইত্যাদির সেটের কথা। সত্যিই অসাধারণ! এদিকে ফেরদৌস ওয়াহিদ ও বালামের সাথে দর্শক পর্বে পপ সংগীতের ৫ কুতুবকে ট্রিবিউট করার বিষয়টি চমত্কার। গানের বাইরে তাদের অপরূপ বন্ধুত্বের একটি মজার স্মৃতিকথা ফেরদৌস ওয়াহিদের মুখ থেকে শুনতে পেলে ভালো লাগতো। বালাম ও ফেরদৌস ওয়াহিদের কণ্ঠে ‘এমন একটা মা দেনা’ গানটি ছিল দারুণ এক পরিবেশনা। একই সাথে সৈকত শিশুর কণ্ঠের গানটি উপস্থাপনার পরপরই সরাসরি না দিয়ে তাদের প্রতিদিনের কার্যক্রমের কিছু দৃশ্যায়ন দেখানোর পরে যদি গানটা আসতো তবে যেন পূর্ণতা পেত! তবে আব্দুল আলীমের গানটা দারুণ গেয়েছেন শিল্পীত্রয়।

তাহসানের গানটি শিল্পীর নিজস্ব ও প্রচলিত ঢঙের শ্রুতিমধুর একটি গান। কিন্তু প্রত্যাশা ছিল ইত্যাদিতে হয়তো অন্য এক তাহসানকে পাবো! যা এর আগের ইত্যাদিতে আমরা বিভিন্ন রকস্টারদের ক্ষেত্রেও দেখে এসেছি। আইয়ুব বাচ্চু যখন ইত্যাদিতে এসেছেন তখন তার প্রচলিত আদল ভেঙে নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছিলেন ইত্যাদিতে।

ইত্যাদির সাথে দর্শকের দীর্ঘসূত্রিতার এক চমত্কার উদাহরণ ছিল কায়সার হামিদ নামের একজন দর্শককে যখন ২০০৩ সালে যখন একটি নিম গাছ দেওয়া হয়েছিল। সেই চারাগাছ ২০ বছরে বড় হয়ে বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সেই দর্শকও এখন ছাত্র থেকে ২ সন্তানের বাবা। একই অনুষ্ঠানের সাথে ভালোবেসে নিজের আঙিনায় সেই গাছের সাথে যে সম্পর্কের বুনন তৈরি করলেন তা একমাত্র ইত্যাদির পক্ষেই সম্ভব।

এর বাইরে অন্যান্য পর্বগুলো ছিল দারুণ নান্দনিক। তবে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক শামসুর রহমানের প্রতিবেদনটি ইত্যাদির সাদা মনের মানুষ খুঁজে দেওয়াটাকে মনে করিয়ে দেয়।

‘ইত্যাদি’ নামের একটি অনুষ্ঠানে মূলত অগণিত নান্দনিকতার সমাবেশ থাকে। এবারের পর্বটিও ছিল তাই। অনুষ্ঠানটির উপসংহার ছিল খুবই ইমোশনাল। ছিল বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার নিওপাড়ার ৪ বোন রহিমা, হালিমা, ফাতেমা ও জরিনার জীবন চিত্র। পানি, মাছ, নৌকা ও বড়শি নিয়েই যাদের জীবন। এই অসহায় চার বোনের জীবন সংগ্রাম দেখে অনেকের চোখে পানি এসেছে। বিশেষ করে যখন তারা বললো, দিনের বেলা কথা শুনতে হয় বলে রাতে বড়শি বেয়ে মাছ ধরে সংসার চালায় তারা। সমাজের শঠতা, এসকল প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাদের এমন সংগ্রামের কথা শুনলে চোখ ভারী হয়ে আসে। তাই ইত্যাদি ক্ষণে ক্ষণে কাঁদায়, হাসায়, আবেগে ভাসায়। এক অদ্ভুতভাবে মোহগ্রস্ত করে রাখেন একজন জাদুকর। তার নাম হানিফ সংকেত। এক পর্যায়ে উপস্থাপক যখন বললেন, ‘অন্যের ব্যাথায় আমাদের সমব্যাথী হওয়াটা খুব জরুরি।’ সত্যিই তো তাই! ব্যক্তিজীবনে হানিফ সংকেতও যেমন। এদেশের অগণিত শিল্পীর সংকটে সবার আগে দাঁড়িয়েছেন তিনি। উদ্যোগ নিয়েছেন। তার ইত্যাদির মাধ্যমেও এ সকল মানুষ যে সাহায্য পায়, পায় সাহস। এ সকল প্রার্থনা আর সারাবিশ্বের বাঙালিদের ভালোবাসাতেই একটি অনুষ্ঠানকে মহীরূহ করে তোলে। জয় হোক এমন আয়োজনের।