সাংবাদিকতার উজ্জ্বল নক্ষত্র গোলাম সারওয়ার বিহীন পাঁচ বছর

মানব জনমে মৃত্যু অবধারিত। তবুও কিছু কিছু মানুষ নিজের কাজের গ্রহণযোগ্যতায় সমাজের দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যান। গোলাম সরওয়ার ছিলেন তেমনই একজন। দেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। একটি প্রতিষ্ঠান, আদর্শ। একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার সবসময় বলতেন সাংবাদিকদের কোন স্থায়ী বন্ধু নেই। কিন্তু তিনিই যেন তার এই না থাকার মধ্যেও অসংখ্য বন্ধু শুভার্থী রেখে গেছেন।

সাংবাদিকতার শিক্ষক ও অভিভাবকের এ উক্তি, আদর্শ ও চেতনা ধারন করে সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যম পাড়ি দিতে পারে উত্তাল সমুদ্র। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বাঙালিয়ানার ধারক ছিলেন তিনি। একাধারে শিক্ষক, বীরমুক্তিযোদ্ধা, দক্ষ সংগঠক ও সফল কিংবদন্তি সম্পাদক গোলাম সারওয়ার সংবাদ প্রকাশে ছিলেন আপসহীন। দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি রচনা করেছিলেন সাংবাদিকতার ঐক্যের কঠিন ভীত। সেই ইস্পাত কঠিন ঐক্যে সাংবাদিকতা পেশা হয়ে ওঠে মর্যাদার। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট বা পিআইবি’র সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ার দীর্ঘ দুই যুগ দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত থাকার পর ১৯৯৯ সালে তাঁর অনন্য সৃস্টি দৈনিক যুগান্তরের যুগান্তকারী সাফল্যের পর ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দৈনিক সমকাল। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় অল্প সময়ে সমকালও হয় পাঠক প্রিয়। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

আলোর দিশারী গোলাম সারওয়ারের মতো মানুষেরা বার বার আসেন না। এ মানুষটি ছাড়া পাঁচটি বছর কেটে গেল আমাদের। সময় বয়ে যায়। অথচ মনে হয় এই তো সে দিনই কথা হলো। কত আদরের মধু মাখা ডাক। সেকি ভোলা যায়।

অজান্তেই চোখে জল এসে মনে করিয়ে দেয় নির্মম সত্যি। আর শোনা যাবে না সেই মধুমাখা ডাক। যা কাউকে বোঝানো যায় না। বিধাতা আমাকে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে পরম স্নেহ আর ভালোবাসা পাওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছিল বলেই তিনি ছিলেন আমার আপনজন। খুব কাছ থেকে দেখে বলতে পারি তিনি ছিলেন অসংখ্য গুণের অধিকারী এক মানবিক মানুষ। খুব অল্পতেই মানুষকে আপন করে নেয়ার এক অসাধারণ আকাশচুম্বি দক্ষতার অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর শিশুসুলভ আচরনে মোহিত হতো সকলে। তাইতো বিনয়ী গোলাম সারওয়ারকে ভালোবাসত সকলে। মানুষের উপকারে নিজেকে বিলিয়েছেন অকাতরে। নিজ হাতে সবাইকে খাওয়াতে ভীষণ পছন্দ করতেন। ভালোবাসতেন ক্রিকেটকে। ব্যক্তিগত জীবনে কারো সঙ্গে বৈরিতা চাননি তিনি। বলতেন, জীবন সংকীর্ণ- ছোট তাই দন্দ্ব-সংঘাত দিয়ে তা বিষাদময় করা উচিত নয়।

প্রকৃতি প্রেমী গোলাম সারওয়ার সময় পেলেই পাগলের মতো ছুটে যেতেন বরিশালের বানারীপাড়ার নিজ গ্রাম জম্বদীপে। মিশে যেতেন মাটি ও মানুষের সাথে। বসে থাকতেন তাঁর প্রিয় সন্ধ্যা নদীর তীরে। যা তাঁর প্রিয় শহর বানারীপাড়ার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। ভালোবাসতেন সন্ধ্যাকে। যদিও সন্ধ্যার গর্ভে বিলীন হয়েছে তাঁর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। বানারীপাড়া পৌর শহরে তাঁর বাসভবন। গ্রাম বাংলার কাদা মাটি মাখা মানুষের  প্রিয় এই মানুষটি বাড়িতে আসা মানেই ছিল বাড়িভর্তি মানুষ। বিরামহীন খাওয়া দাওয়া। স্হানীয়দের কবিতা, গান আর আড্ডা। সাহিত্য আর সংস্কৃতির এক মিলন মেলা। চলতো উৎসব। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে নানান শ্রেণি পেশার মানুষের পদচারনায় মুখর থাকত তার বাসভবন ‘সিতারা’। মায়ের নামে গ্রামের নিজ বাড়ির  নামকরণ করেন ‘সিতারা’। আর ঢাকার উত্তরার বাড়ির নাম একমাত্র আদরের কন্যার নামে ‘রত্না’। গোলাম সারওয়ার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন এমন খবরে আশপাশের এমনকি দূরের সাংবাদিকরাও ছুটে যেতেন তাঁর সান্নিধ্য পেতে। কারণ তারা জানতেন গ্রামের বাড়িতে থাকা গোলাম সারওয়ার আর বার্তাকক্ষের গোলাম সারওয়ার এক নন। তিনি সব সময় সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন। চেষ্টা করতেন তাদের জন্য কিছু করতে। করেছেনও অনেক।

 গোলাম সারওয়ার যেমন পরোপকারী ও জনন্দিত ছিলেন, তেমনি নিজ পরিবারের সদস্যদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। প্রাণপ্রিয় একমাত্র কন্যা সুষমা নাঈম রত্না ও জামাতা মিয়া নাঈম হাবিব, দুই ছেলে গোলাম শাহরিয়ার রঞ্জন ও গোলাম সাব্বির অন্জন সপরিবারে যুক্তরাস্ট্রের বাসিন্দা হওয়ায় কাজের ফাঁকে সুযোগ করে নিয়মিত ছুটে যেতেন সেখানে। সঙ্গী হতেন স্ত্রী সালেহা সারওয়ার। আমিও মুখিয়ে থাকতাম তাঁর সান্নিধ্য পেতে। যুক্তরাস্ট্রের শত ব্যস্ততার মাঝে কিছুটা সময় করে আসতেন আমার বাসায়ও।

অল্পতেই উষ্ণ আবার মুহূর্তেই শীতল হওয়া গোলাম সারওয়ার সব সময় সাম্যের কথা বলতেন। তিনি বলতেন, তাঁর জীবনের অনেক স্বপ্নই পূরণ হয়েছে। তাঁর দু'চোখ ভরা ছিল আরো কিছু স্বপ্ন। কিন্তু সবার সব চাওয়া তো পূরন হয় না। তাঁর দৃঢ মনোবল যেমন তাঁকে সাফল্য দিয়েছে তেমনি লড়াই করতে শিখিয়েছে নানা জটিল রোগের বিরুদ্ধেও। যেখানেই থাকতেন যেভাবেই থাকতেন সংবাদ আর সাংবাদিকতা ছিল তার জীবনেরই অংশ। শত ব্যস্ততার মাঝেও সংবাদ ছিল সবার উপরে। তাই হয়তো তিনি চেয়েছিলেন বার্তা কক্ষেই যেন তার মৃত্যু হয়। তিনি লিখেছিলেন, মৃত্যু অমোঘ, অনিবার্য। এই ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা কারও নেই। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার মধ্যেই সুখ-দুঃখের ভেলায় জীবননৌকা কখনও শান্ত, কখনও বা ঊর্মিমুখর সাগরে এগিয়ে চলে। নৌকাটি কখন হঠাৎ থেমে যাবে, তা শুধু একজনই জানেন- যিনি অলক্ষ্যে বসে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। অবশেষে তাই সত্যি হলো। সবাইকে কাঁদিয়ে গোলাম সারওয়ার চলে গেলেন। যেখান থেকে কেউ ফেরে না। সবাইকেই যেতে হবে সেখানে।