শোক শক্তি হয়েই ফিরেছে!

শোক, দীপ্ত শপথের উচ্চারণেও ধ্বনিত হয়। গোষ্ঠীগত প্রতিজ্ঞায় মহান পূর্বসূরির আদর্শকে সমুন্নত রাখার উদ্যোগেই আজকের বাংলাদেশ। আমরা আমাদের জাতির পিতার কোনো কিছুকেই ভুলিনি। মনেপ্রাণে ধারণ করে গিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবনের প্রতিটি ক্ষণে তার পিতার সব স্বপ্ন পূরণে দিবানিশি পরিশ্রম করে দেখাতে পেরেছেন, শোক অনেক সময় একটি জাতির ভবিষ্যত্ নির্ধারণেও শক্তি হয়ে ফিরে আসতে পারে।

তার সংগ্রামী পথচলায় প্রায় আড়াই যুগে কত জনকে বিশ্বাসী সহকর্মী হিসেবে পেয়েছেন, তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বাসী হওয়ার শর্ত পূরণ করা সহজ নয়। সবিশেষ যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা না বলে প্রতিশ্রুতি বলাই শ্রেয়। প্রথমত, নিজের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়। শপথ নিয়ে ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীগত আস্থার প্রতিদানে নিজেকে সঁপে দিতে হয়।

রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাভাষ্য বলে, আদেশক্রমে অনুরোধের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য রাখার অনুশীলনে ভর করে বহু জাতি রাজনৈতিক বন্ধনের প্রতিজ্ঞায় হিরো পেয়েছে। যেমনটি, এই প্রিয় বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জাতির হিরো। সংগত কারণেই তিনি বাংলাদেশের জাতির পিতা হতে পেরেছিলেন। তার ভাগ্যও ভালো ছিল। বিশ্বাসী নেতা হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান কিংবা মনসুর আলীদের পেয়েছিলেন। ১৫ আগস্ট ২০২৩, অযাচিত, অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, ঐতিহ্যবিরুদ্ধ, গৌরববিরুদ্ধ ও পৈশাচিক কাণ্ড একটি অপশক্তি ঘটাল।  

বঙ্গবন্ধুকে অকালে হারানোর ক্ষত, প্রতিটি রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিকে ভাবায়, কাঁদায়। ঐ মানুষটি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ অল্প কয়েক বছরেই আজকের সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়া পর্যায়ে চলে যেত। আমার বাবা ও চাচাতুল্য কামারুজ্জামান ও তাজউদ্দীনেরা তার সঙ্গে ঐ বিশ্বাসী হয়ে থাকলেই সবকিছু ঠিকঠাক চলত। ২০০৮ সালে যদি রাজনৈতিক ধারাভাষ্য প্রদান করতে হতো, তখন আমাকে বলতে হতো যে, ৩৭ বছর বয়স হয়েও দেশ পিছিয়ে আছে ২০ বছরের মতো। প্রকৃতিও যেন তাই জবাব দিয়ে গেল। আজ ২০২৩ সালে এসে দাঁড়িয়ে উঁচু স্বরে বলতে পারছি, ঐ বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার হাত ধরে গেল সাড়ে ১৪ বছরে পিছিয়ে থাকা কুড়ি বছরের রিকভারি হয়েছে। 

জনপ্রিয়তা ও জন আস্থা অর্জন করার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যত সফলতা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই রাজনৈতিক সত্তা, যার মধ্যকার দেশপ্রেম ও সততা অতি উচ্চ পর্যায়ের ছিল। পাশাপাশি আবেগ ছিল তার মনের আবহে চোখ ও মুখে। এমনিতেই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বক্তা হওয়ার গুণাবলি ছিলই, উপরন্তু  ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা, তাকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তবে নিজের সত্তায় থাকা প্রবল দূরদৃষ্টির সক্ষমতার ধর্মটি, তার সঙ্গে কাজ করতে থাকা নেতাকর্মীরা অতটা বুঝতে পারেনি। এখানেই রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত হওয়া আর না হওয়ার বোধের ঘাটতি। বঙ্গবন্ধুর অতি উচ্চতার জ্ঞান ও স্বাপ্নিকবোধ সম্যক ধারণা তার সমসাময়িক অন্যজনেরা বুঝতে পারেনি। এই বুঝতে না পারার কথিত বুদ্ধিজীবী রাজনীতিকদের কেউ কেউ তাই দিনশেষে অবিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতাদের তাঁবুতে গিয়ে এক সামরিক অফিসারের উচ্চাভিলাসী অভিলাষের সড়কে পথিক হন। যাদের কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন; কিন্তু তারা রাজনীতিক হতে পারেননি।

বিদেশি রাজনৈতিক অপশক্তি দেখতে পেল, এই বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তাদের স্বার্থ অর্জিত হবে না। অন্যদিকে স্বাধীনতা-পরবর্তী জাসদের মতো দল গঠন করা, আওয়ামী লীগে অবিশ্বাসী নেতৃবৃন্দের ওপর আস্থা রাখা এবং একাত্তরের পরাজিত শক্তির নতুন প্রতীকী নেতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের নেপথ্য ভূমিকা ও অপরাপর ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট তৈরির মধ্য দিয়েই ১৫ আগস্ট, যা সারা দুনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনার একটি বলে অনুমিত হয়।

বলা বাহুল্য, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ছাড়াও নিহত হন তার স্ত্রী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। এছাড়াও তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনসহ নিহত হন আরো ১৬ জন। ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু পুত্র শেখ রাসেল; পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী কামাল; ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নীপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগনে শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি। বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসেন কর্নেল জামিলউদ্দীন, তিনিও তখন নিহত হন। দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা। 

বঙ্গবন্ধু এক দিনে তৈরি হন নাই। তিনি খুব কাছ থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শের-এ-বাংলা, মওলানা ভাসানীদের দেখেছিলেন। তাদের আদেশগুলোকে ধারণ করতেন। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, যে রাজনৈতিক সত্তা কোনো দিন আদেশ মানতেই শেখেনি, সে কোনো দিন নেতা হয়ে ভালো কোনো আদেশ দিতেই পারবে না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই নেতা যিনি ১৯৭১ সালে সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে এক করতে পেরেছিলেন। অধিকার নিয়ে আদেশ দিতে পারতেন। মহান নেতা হিসেবে মানুষের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব দিতেন। ওয়রেন বেনিস বলেছিলেন, তিনিই নেতা, যিনি তার চিন্তাগুলোকে বাস্তবে পরিণত করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু সেই নেতা, যিনি সোনার বাংলাদেশ গড়ার নিমিত্তে ঝুঁকি নিতেন।

বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির ইতিহাসের আদ্যপান্তকে এক কথায় বলতে গেলে, ১৫ আগস্ট শুধু বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বিয়োগের দিন নয়। একজন শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে আমরা অনেক আগেই উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতাম। শোক ফলত শক্তি হয়েই প্রত্যাবর্তন করেছে।

লেখক :সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ