ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়, আমরা ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়ছি। তবে ২০১৯, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ থেকে এর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, করোনা মহামারি শুরুর মাত্র এক বছরের মাথায় আমরা এর টিকা পেয়ে গেলাম। সারা বিশ্বের মানুষই করোনা টিকার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডেঙ্গু এত বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকোপ ছড়ালেও কেন এখনো এর টিকা সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকের মনে এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। এছাড়া অনেকেই জানতে চায়, আমাদের দেশে ডেঙ্গুর কোনো টিকা দেওয়া হয় কি না।
এ বিষয়ে বলতে গেলে ডেঙ্গুর টিকা যে একেবারে নেই তা নয়। শুরুর দিকে ডেঙ্গুর কিছু কিছু ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছিল। দেখা যায়, ডেঙ্গুর প্রধানত চার ধরনের ভাইরাস টাইপ রয়েছে। টাইপ ১, ২, ৩ ও ৪। তবে এমন কোনো ভ্যাকসিন বের হয়নি যে এই চারটা টাইপের বিপক্ষেই তা কাজ করবে। সেজন্য বলা যায়, ডেঙ্গুর জন্য কার্যকরী কোনো ভ্যাকসিন এখনো তৈরি হয়নি। এর পরও যে সব টিকা এখন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ, এর কোনোটিরই স্বীকৃতি দেয়নি ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (WHO)। যদিও ডেঙ্গুর টিকা তৈরি করতে অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুটি টিকা কিন্তু বের হয়েছেও, একটি ডেনভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ভ্যাকসিন, আরেকটি কিউডেঙ্গা (Qdenga).
ডেনভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia): ডেনভ্যাক্সিয়া টিকাটি বের করেছে ফ্রান্সের একটি ওষুধ কোম্পানি। কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি সবাইকে দেওয়া যায় না। এটি সাধারণত বাচ্চাদের দেওয়া হয়। যাদের বয়স ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে, শুধুমাত্র তারাই এটি ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ ৯ বছরের নিচে যারা, আবার ১৬ বছরের ওপরে যারা, তাদের কেউই এই টিকা দিতে পারবে না। এছাড়া ঢালাওভাবেও এই টিকা সবাইকে দেওয়া যায় না। যাদের একবারও ডেঙ্গু হয়নি, তাদের এই টিকা দেওয়া যাবে না। সাধারণত যাদের টেস্ট করে ডেঙ্গু পজিটিভ পাওয়া যায় বা আগে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল, এমন মানুষদেরই টিকাটি দেওয়া যায়। এর বাইরে কাউকে এই টিকা দেওয়া যায় না। টিকাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ রকম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণত ডেনভ্যাক্সিয়া তিনটা ডোজে দিতে হয় ছয় মাস পরপর। তবে এর কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহের কথা শোনা যায়। এমনকি এই ভ্যাকসিনটি ব্যবহারের ফলে কিছু জটিলতা দেখা যায়, সে কারণে এর কার্যকারিতা নিয়ে অনেক সন্দেহ রয়ে গেছে।
কিউডেঙ্গা (Qdenga): কিউডেঙ্গা হচ্ছে জাপানভিত্তিক একটি ডেঙ্গু টিকা। এটিও ঢালাওভাবে সবাইকে দেওয়া যায় না। শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট বয়সের বাচ্চাদের এই টিকা দেওয়া হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতিমধ্যে টিকাটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। শোনা যায়, কিউডেঙ্গা টিকাটি তুলনামূলক বেশি কাজ করে, এর সাইড ইফেক্টও কম। টিকাটি ছয় বছর থেকে শুরু করে ৪৫ বছরের মধ্যে যে কাউকে দেওয়া হয়। এই টিকাটির দুটি ভ্যাকসিন দিতে হয় তিন মাস পরপর। বলা হয়, কিউডেঙ্গার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অন্যান্য টিকার তুলনায় খুবই কম। যদিও এটি ঢালাওভাবে সবাই ব্যবহার করতে পারেন না। পৃথিবীর প্রায় ২০টা দেশে টিকাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়াতে কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিনটি প্রচুর পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। দাবি করা হয়, টিকাটি একবার নিলে চার বছর পর্যন্ত এর কার্যকারিতা থাকে। এই টিকা ৮০ ভাগ কাজ করে এবং যারা এটি একবার গ্রহণ করে, তাদের ৯০ ভাগ রোগীকে হাসপাতালে যেতে হয় না।
তবে একটা বিষয় জানিয়ে রাখা ভালো যে, ডেনভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ও কিউডেঙ্গার (Qdenga) কোনোটিই কিন্তু এখনো স্বীকৃতি পায়নি ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের (WHO)। যে দেশগুলো টিকাটি দিচ্ছে, তারা নিজ দায়িত্বেই দিচ্ছে। যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি নেই, তাই আমাদের দেশে এ ধরনের টিকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে এখন ইন্দোনেশিয়াতে কিউডেঙ্গা টিকাটি বেশি দেওয়া হচ্ছে। আমরা সেখান কার ফলাফলটা দেখি। যদি ফলাফলটা ইতিবাচক, কার্যকরী ও ভালো হয়, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের দেশেও এই ধরনের টিকা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।
এছাড়া আরও দুই-একটি ডেঙ্গু টিকা ট্রায়ালে রয়েছে। ভারতেও ডেঙ্গুর একটি টিকা ট্রায়ালে রয়েছে। কিন্তু এখনো এগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়নি। ডেঙ্গুর আরেকটা ভ্যাকসিন আছে ‘টেট্রাভালেন’ নামের, যেটা আমেরিকাতে ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছে। এটা ট্রায়াল শেষ করে বাজারে আসতে এখনো তিন থেকে চার বছর সময় লেগে যাবে। সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ডেঙ্গু যেহেতু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সেজন্য আমাদেরও চেষ্টা থাকবে যে, নিজেরা ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারি কি না। আর যতদিন কার্যকরী ভ্যাকসিন আমরা না পাই, ততদিন আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। যেহেতু ডেঙ্গু রোগের শত্রু আমরা চিনি, যা ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত এডিস মশা, তাই ডেঙ্গু থেকে নিরাপদে থাকতে আমাদের প্রতিকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়টি আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।