চড়া দামে কেনাকাটার মাধ্যমে প্রায় ৪০ কোটি টাকার অনিয়ম করা হয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে জোনে। দুই-তিন গুণ দামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব অনিয়ম করা হয়েছে। এসব অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে রেলওয়ের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের পরিবহন অডিট অধিদপ্তর।
এসব অনিয়মের মধ্যে নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের ভিআইপি বিশ্রামাগারের জন্য চড়া দামে পর্দা কেনায় বড় ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে। প্রতিটি পর্দা ১৪ হাজার ৫৯১ টাকায় কেনা হয়েছে। এতে ৫০টি পর্দা কেনা বাবদ ব্যয় করা হয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৫০ টাকা। খাতা-কলমে চড়া দামে ৫০টি পর্দা কেনা হলেও নিরীক্ষার সময় নিরীক্ষাকারী দল নাটোর স্টেশনে ২৫টি পর্দার হিসাব পায়। বাকি ২৫টি পর্দার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এছাড়া সিওএস পশ্চিম খুলনা রিমডেলিং স্টেশনের জন্য ফিটিংসসহ ৮৪টি পর্দা কেনা হয়। এর প্রতিটির দাম ধরা হয় ১৪ হাজার ৫৯৫ টাকা। একই সঙ্গে আরো ১৬২টি পর্দা কেনা হয় ৭ হাজার ৮৪৮ টাকা করে। এই দুই স্তরের পর্দার মূল্য দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৯৭ হাজার ৩৫৬ টাকা। খুলনা রিমডেলিং স্টেশনের মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার সব পর্দা বুঝে নিয়েছেন মর্মে খাতা-কলমে উল্লেখ করেন। কিন্তু নিরীক্ষা দল দুই স্তরের ২৪৬টি পর্দা খুঁজতে গিয়ে পান ১৫২টি। অবশিষ্ট ৯৪টি পর্দার সন্ধান মেলেনি। এতে করে খুলনায় ৯৪টি পর্দা না থাকায় সরকারের ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৮২১ টাকা এবং নাটোর স্টেশনে ২৫টি পর্দা না থাকায় ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫০ টাকা ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
তবে রাজশাহী অঞ্চলের একাধিক পর্দা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জানা গেছে, দেশে সর্বোচ্চ উন্নতমানের পর্দার সেই সময়ের বাজারদর ছিল দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। এছাড়া চীন থেকে আমদানিকৃত উন্নতমানের পর্দার দাম প্রতিটি ৩ হাজার ২০০ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পশ্চিম রেলওয়ে অঞ্চলের একাধিক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, দেশি-বিদেশি মূল্যকেও ছাড়িয়ে গেছে রেলের পর্দার দাম। তাদের ভাষ্যমতে, সাড়ে ১৪ হাজার এবং প্রায় ৮ হাজার টাকা মূল্যে যেসব পর্দা কেনা হয়েছে, বাস্তবে তার মূল্য দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। রাজশাহী পর্দা গ্যালারির স্বত্বাধিকারী এফাজুর রহমান বলেন, চার কুঁচির প্রতি পিস পর্দার দাম বড়জোর দেড় হাজার টাকা। চীনের উন্নত পর্দা প্রতিটি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ টাকা। পর্দায় ডিজাইন করলে ৮০০ টাকার মতো লাগে। তাতে প্রতিটি পর্দায় ৪ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। তবে নিরীক্ষা দল পর্দা কেনায় চড়া দাম নির্ধারণে সরকারের ক্ষতির কথাও বলেছে।
অডিট প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে—রাজশাহী, রংপুর, ফরিদপুর ও খুলনা বিভাগ নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। পুরো পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে স্টেশনগুলোর জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিভিন্ন কেনাকাটা বাবদ ব্যয় করা হয়েছে ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ ১৬ হাজার ৮২ টাকা। ক্রয়সামগ্রীর মধ্যে লাগেজ ট্রলি, ক্যাশসেফ, হ্যান্ড বেরো প্ল্যাটফরম ট্রলির মূল্য বাবদ ৪১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৩৫ টাকা ব্যয় করা হয়। এছাড়া ৫ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৮ টাকায় ফায়ার এক্সটিংগুইশার, রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস, এলইডি ইলেকট্রিক চার্জেবল সিগন্যাল লাইট, চিকিত্সা বিভাগের জন্য কনজারভেন্সি মালপত্র, চিকিত্সাসামগ্রী কেনা হয়েছে। এছাড়া বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ উচ্চমূল্যে ১৩৪টি পর্দাও কেনা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের কেনাকাটায় বাজারদরের চেয়ে চড়া দাম ব্যবহার করা হয়েছে। এসব কেনাকাটা করা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। নিরীক্ষার সময় এসব মালামালের বেশির ভাগই সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোতে পাওয়া যায়নি। এসব অনিয়মের বিষয়ে রেলওয়ের প্রিন্সিপাল হিসাব অফিসারকে দুই দফা চিঠি দিয়েছে অডিট অধিদপ্তর। তবে সেই চিঠির কোনো জবাব মেলেনি। নিরীক্ষার সময় পশ্চিম রেলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক ছিলেন এ এস এম শাহনেওয়াজ।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, বিভিন্ন কেনাকাটায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পশ্চিম রেলওয়েতে প্রায় ৪০ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। মূলত প্রাক্কলন প্রণয়নকারী, অনুমোদনকারী, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি, দরপত্র মূল্যায়ন সুপারিশ অনুমোদনকারী ও ঠিকাদারেরা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
তিনি বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে পর্দা কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত থাকায় তত্কালীন প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এ এস এম শাহনেওয়াজকে ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। বেশ কয়েক জনের ব্যাপারে তদন্ত চলছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়ের কেনাকাটা নিয়ে এই নিরীক্ষা করা হয়। প্রতিবেদনে অনিয়মকারী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অধিক খরচ করা অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের এসব অনিয়মের নিরীক্ষা প্রতিবেদন ২৫ জুন জাতীয় সংসদে উঠেছে। এটি মন্ত্রণালয় হয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে যাবে। তারপর অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাটোর রেলস্টেশনের মাস্টার অশোক কুমার ঘোষ গতকাল ইত্তেফাককে জানান, সেই সময় পাঠানো ২০টি পর্দা এখনো আছে। বছর দেড়েক আগে তদন্তও হয়।
পশ্চিম রেলওয়ে রাজশাহী জোনের সিএমই আব্দুল মতিন চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি পরে কথা বলতে চান।