টাকা না থাকিবার বিপদ লইয়া শত শত কথা বলা যায়। টাকা না থাকিলে জীবনের সকল গন্ধ-বর্ণ-রং-রস ফ্যাকাশে হইয়া যায়। বলা হইয়া থাকে, টাকা দেখিলে নাকি কাঠের পুতুলও হাঁ করিয়া ফেলে। টাকা মানুষের শরীর ও মনকেও উজ্জীবিত করে। মানুষের কত টাকা প্রয়োজন—তাহার কোনো ঊর্ধ্বসীমা নাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় যেমন বলিয়াছেন—‘এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি—।’ অর্থাত্ মানুষের অর্থ উপার্জনের তৃষ্ণাও কখনো ফুরায় না।
কিন্তু টাকা থাকিবারও অনেক বিপদ রহিয়াছে। জগতে অ্যাবস্যুলেট ব্ল্যাক কিংবা হোয়াইট তথা সম্পূর্ণ সাদা কিংবা কালো বলিয়া যেমন কিছু হয় না, তেমনি টাকার ক্ষেত্রেও সত্য। সাদার মধ্যে কিছুটা হইলেও কালো থাকে, কালোর মধ্যেও থাকে সাদা। সাদাকে যতখানি কালো তাহার সাদা ভাব নষ্ট করিয়া দিতে না পারে, ততখানি কালো সম্ভবত মানিয়া লওয়া যায়। কিন্তু অর্থনীতির হিসাব খুব সহজ নহে। অর্থনীতিতে কালোটাকার প্রাদুর্ভাব বাড়িলে, সামগ্রিক অর্থনীতিকে দুর্বল করিতে থাকে। কালোটাকা কী? ‘ইনভেস্টোপিডিয়া’য় ইহার সহজ উত্তর এইভাবে বলা হইয়াছে— কালোটাকা হইল সেই অর্থ যাহার উপর সরকারকে ট্যাক্স দেওয়া হয় না। যেমন একটি দোকান তাহার পণ্যদ্রব্যের জন্য নগদ টাকা গ্রহণ করে এবং তাহার গ্রাহকদের রসিদ প্রদান করে না। সেই দোকানটি কালোটাকায় লেনদেন করিতেছে, কারণ ইহা রেকর্ড না করা বিক্রয়ের উপর কর প্রদান করিবে না। আবার, কেহ ১০০ টাকা মূল্যের সম্পদ ক্রয় করিল, কিন্তু অফিশিয়ালি দেখানো হইল সম্পত্তিটির মূল্য ২৫ টাকা এবং সেই ২৫ টাকার উপর ক্রয়-কর প্রদান করা হইল। এই ক্ষেত্রে বাকি ৭৫ টাকা কালোটাকায় লেনদেন হইল। উভয় উদাহরণে বিক্রেতারা আইনি উত্স হইতে অর্থ উপার্জন করিয়াছে কিন্তু কর ফাঁকি দিয়াছে। বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্লেষকরা দেখিয়াছেন, কালোটাকার সবচাইতে বড় উত্স হইল আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি। আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতির কার্যকলাপের মধ্যে রহিয়াছে মাদকদ্রব্য, আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয়বিক্রয়, মানব পাচার ইত্যাদি। ব্ল্যাক মার্কেট ক্রিয়াকলাপগুলিও কম গুরুতর অপরাধের সহিত জড়িত, যেমন নকল পণ্য বিক্রয়, চুরি করা ক্রেডিট কার্ড বা কপিরাইটযুক্ত উপাদানের পাইরেটেড সংস্করণ বিক্রয় ইত্যাদি। তাহা ছাড়া আমদানি ও রপ্তানির আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও কালোটাকার মার্কেট বড় হয়। বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতির বেশ বড় একটি অংশ। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ইনভেস্টোপিডিয়ায় ম্যাথিউ জনস্টন-এর ‘হাউ বিগ ইজ অ্যামেরিকা’স আন্ডারগ্রাউন্ট ইকোনমি?’ কলামে বলা হইয়াছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি মার্কিন মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১১ হইতে ১২ শতাংশ।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, কালোটাকার সঙ্গে যুক্ত একটি দেশের আয়ের অংশ দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। তবে যে কোনো দেশের অর্থনীতিতে কালোটাকার পরিমাণ অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। ইহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই যে, আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতির সহিত সম্পৃক্ত কারবারিরা তাহাদের কার্যকলাপ ছদ্মবেশের মাধ্যমে সম্পাদন করিতে পারে। জার্মানি এএমএল হোয়াইটপেপার-এর ‘স্যাংশন রিপোর্ট’ ওয়েবসাইটের ‘ব্যাসেল ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স’-এর প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, কালোটাকার তৈরি প্রবণতা যেই সকল দেশে অধিক সেইখানে মানি লন্ডারিংয়ের হারো বেশি। তাহাদের রিপোর্ট অনুযায়ী মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচাইতে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলি হইল—কঙ্গো, হাইতি, মিয়ানমার, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার, কম্বোডিয়া প্রভৃতি দেশ। অন্যদিকে মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচাইতে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলি হইল—ফিনল্যান্ড, এন্ডোরা, সুইডেন, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সান মারিনো, স্লোভেনিয়া, লিথুয়ানিয়া, নরওয়ে, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ। দেখা গিয়াছে, অধিক পরিমাণে ঘুষ ও দুর্নীতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব, আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলিতে মানি লন্ডারিং ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। সুতরাং এই বিষয়গুলি কোনো রাষ্ট্র ঠিক পথে পরিচালিত করিতে পারিলেই সেইখানে আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতি সম্প্রসারিত হইতে পারিবে না।