প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও স্মার্ট জনশক্তি বিনির্মাণে অভিভাবকদের ভূমিকা

এক চন্দ্রই যে অন্ধকার দূর করে, সকল তারা মিলেও তা পারে না। একই ভাবে বলা যায়, অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত মা-বাবারাই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে পারেন, যেটা অনেক উচ্চ শিক্ষিত মা-বাবাদের দিয়েও সম্ভব হয় না। প্রকৃতপক্ষে, সন্তান লালন পালনে মা-বাবাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয় না। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার অদম্য আগ্রহ, আন্তরিকতা ও প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করতে পারে। প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রথম শিক্ষক হচ্ছেন মা-বাবা। শিশু জন্ম নেয়ার পর থেকেই মা-বাবার কাছ থেকে শিখে, এরপর বিদ্যালয়েই তার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ শুরু হয়। শিক্ষা হলো ব্যক্তির আচরণের কাঙ্খিত পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও উন্নয়ন যা জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। ব্যক্তির আচরণের সর্বাঙ্গীন বিকাশ ও ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করাই শিক্ষার মূল কাজ।

জন্মের পরের প্রথম ৫ বছর একটি শিশুর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এ সময়টাতে শিশু তার মা-বাবার কাছেই বড় হয়, যা কিছু শেখার মা বাবার কাছ থেকেই শিখে। আর পরিবার থেকেই প্রাপ্ত শিক্ষা একটি শিশুর সারাজীবনের ভিত তৈরি করে দেয়, তাইতো সচরাচর বলা হয়- ব্যবহারেই বংশের পরিচয়। ঠিক একই রকম ভাবে একটি উন্নত সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাতির ব্যবহার ও আত্মমর্যাদা পৃথিবীর প্রাচীনতম শিক্ষাঙ্গন পরিবার থেকেই মানুষ পেয়ে থাকে। তাই মা বাবা এবং পরিবারের অন্যান্য অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানকে শৈশব থেকেই শিল্প সংস্কৃতি, সাহিত্য ঐতিহ্যজ্ঞান সম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে আগ্রহী, দক্ষ ও স্মার্ট করে তোলা। কারণ প্রতিটি শিশুর মন মানসিকতা নরম কাদার মতো থাকে, নরম কাদামাটি দিয়ে যেমন যেকোন বস্তু তৈরি করা যায়, ঠিক তেমনি অভিভাবকরা যেমন ভাবে শিশুকে চালনা করবে ঠিক তেমনি হওয়ার সম্ভবনা থাকে।

মা-বাবার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর শিশু শিখতে যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানেই শুরু হয় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ। তাই, প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবনে ব্যক্তিত্বপূর্ণ প্রকাশ ও আজীবন শিখনের ভিত্তি তৈরি করে। সে কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুসংগঠিত করে সুনাগরিক সৃষ্টি এবং প্রগতিশীল ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সব শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষার মূল কাজ হলো শিশুর সহজাত সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে জ্ঞানভিত্তিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আবেগীয় ও শারীরিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। আর এই প্রাথমিক শিক্ষা শিশু অভিভাবক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছেই প্রথম শুরু করে।

তাই প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও স্মার্ট জনশক্তি বিনির্মাণে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদেরকে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, বিনয় ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার দীক্ষা অবশ্যই পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে, শিশু সবার আগে শিখে তার পিতা মাতা ও পরিবার থেকেই। তাই সবার আগে পিতা মাতা, অভিভাবকদেরই শিশুর শারীরিক এবং মানসিক পরিচর্যা সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে পরিষ্কার ভাবে। আমাদের সমাজে সন্তানের পিতা, মাতা বা অভিভাবকরা অনেকে সন্তান জন্মের আগেই অনাগত সন্তানদের নিয়ে নিয়ত তথা দৃঢ়সংকল্প করেন যে সন্তানকে মাস্টার, ব্যারিস্টার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি বিশেষ কিছু বানাবেন। অনেককে দেখা যায় তাঁর লক্ষ্য পূরণে শিশুর রুচি, প্রকৃতি, পছন্দ, ইচ্ছা এবং সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন। আসলে আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সন্তানকে সৎ আদর্শবান ভালো মানুষ বানানো।

আমাদের দেশে খুব কম অভিভাবকই আছেন যারা তাদের বাচ্চাদের ক্লাসে প্রথম বানাতে চান না। আজকাল গতানুগতিক পড়ালেখার প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক শিশুর শৈশবকাল মলিন হতে চলেছে। তার মনের প্রফুল্লতা হারিয়ে ফেলছে। চারপাশের পরিবেশটা তার কাছে নিরানন্দময় হয়ে গেছে। খোলা আকাশের নিচে, নিজের মতো করে শিশুরা ছুটতে চায়; তাদের ছুটতে দিতে হবে- থামিয়ে দিলে হবে না। সন্তানের সঙ্গে বাবা-মা'র দুরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। শিশু যেন অকপটে বাবা-মার কাছে তার সমস্যার কথা বলতে পারে। বাবা-মা হবেন শিশুর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। শিশুর ওপর কোনো কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

এসব বিষয়ে, অভিভাবকদের উচিত শিক্ষকদের সাথে সমন্বয় করা। শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিটি অভিভাবক মুঠোফোনে হলেও অন্তত সপ্তাহে এক দিন শিক্ষকদের কাছে ছাত্রদের বিষয়ে জানতে চাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে লব্ধ ধারণা অভিভাবকদের সাথে শেয়ার করবেন। যে কোন সমস্যা সমাধানে তাদের পরামর্শ দেবেন এবং সাহায্য করবেন। বিদ্যালয় কর্তৃক সময়ে সময়ে আয়োজিত প্রতিটি অভিভাবক সমাবেশ, মা সমাবেশ এবং উঠান বৈঠকে উপস্থিত হয়ে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে পরামর্শ দিতে পারেন এবং শিক্ষকদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন অভিভাবরা।

শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে প্রথমে বাবা-মা এবং অন্যান্য অভিভাবকদেরও স্মার্ট ও আধুনিক মন মানসিকতার মানুষ হয়ে উঠতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের মতো অভিভাবকদের ভূমিকাও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নির্ভরতা কমিয়ে মানসিক চাপ মুক্ত করতে সহায়তা করা অভিভাবকদের একান্ত দায়িত্ব। পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। এ ব্যাপারে অভিভাবক এবং সমাজকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি গল্প বই পড়া, বেড়াতে যাওয়া, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করে সৃজনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। যেসব অভিভাবকরা প্রযুক্তির ব্যবহারে অজ্ঞ তাদেরও উচিত তা শিখে নেয়া। বিশেষ করে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে পারা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর ব্যবহার, ইন্টারনেট ব্রাউজ করা, গুগল বা ইউটিউব সার্চিং ইত্যাদি। এগুলো শিখে নেয়া তেমন কোন কঠিন কিছু না। এগুলোর ব্যবহার শিখতে উচ্চশিক্ষায় ডিগ্রিলাভ করতে হয় না। যেমন বৈদ্যুতিক বাতি জ্বেলে আলো উপভোগের জন্য বিদ্যুৎ কোন পাওয়ার হাউসে উৎপন্ন হচ্ছে, কোন ট্রান্সমিশন লাইন দিয়ে কীভাবে আসছে, বাতি তৈরি হয়েছে কীভাবে, তা যিনি জানেন, তিনি যেমন সুইস টিপে ঘর আলোকময় করে দেখতে পারেন, তেমনি যিনি এসব কিছুই জানেন না, শুধু সুইচ অন/অফ করতে জানেন, তিনিও একই ভাবে ঘর আলোকিত করতে পারেন। অর্থাৎ আলো জ্বালানোর জন্য অন/অফ করতে জানাটাই যথেষ্ট।

জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও গতিশীল সমাজ গঠনে সময়োপযোগী গুণগত প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন স্মার্ট অভিভাবকরা। আদর্শ অভিভাবক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই পড়ার পাশাপাশি তাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর মনমানসিকতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। সর্বোপরি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিল্প সংস্কৃতি, সাহিত্য ঐতিহ্য, বিজ্ঞান চর্চা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে আগ্রহী এবং পারদর্শী করে তুলতে হবে এবং নিজেও এসব বিষয় অন্তরে লালন পালন করবেন এবং চর্চা করার চেষ্টা করবেন। এবং প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।

লেখক : উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর