যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন তার নিয়ম সংবিধানে রয়েছে এবং এগুলো বেশ সহজ। একজন প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে, তাকে জন্মগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে এবং কমপক্ষে ১৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার পরও কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো জর্জ ডব্লিউ বুশ। মদ্যপান করে গাড়ি চালানোর জন্য যিনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে একে সামান্য অপরাধ হিসেবে ধরা হয়; কিন্তু এর পরও তিনি পরপর দুই মেয়াদে হোয়াইট হাউজে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে চারটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন। সংবিধানে উল্লেখ করা নিয়ম অনুযায়ী তিনি নির্বাচন করার যোগ্য হলেও একদল আইন বিশেষজ্ঞ সংবিধানের একটি সংশোধনীর উল্লেখ করে তাকে প্রেসিডেন্ট পদে নিষিদ্ধ করার সুযোগ থাকার কথা বলছেন।
কোন আইনে নিষিদ্ধ হবেন ট্রাম্প
বিশিষ্ট রক্ষণশীল আইন বিশেষজ্ঞরা বারবারই একটা সাংবিধানিক যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছেন যে, ২০২৪ সালের রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল উলটে দেওয়ার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। শনিবার দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনে সর্বশেষ এই আইনি বিধিবিধানের কথা এসেছে। উদার আইনের অধ্যাপক লরেন্স ট্রাইব এবং জে. মাইকেল লুটিগ এই আইনি বিধিবিধানের কথা উল্লেখ করেছেন।
জে. মাইকেল লুটিগ সাবেক ফেডারেল আপিল বিচারক এবং একজন বিশিষ্ট রক্ষণশীল, যিনি নির্বাচনের পরে ট্রাম্পের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচক হয়ে উঠেছেন। তাদের মতের সঙ্গে সব আইন বিশেষজ্ঞ একমত নন। তারা বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দিতে চান। তবে লুটিগ ও ট্রাইবের নিবন্ধ সংবিধান এবং ২০২১ সালের বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে একটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। সবাই একমত না হলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাদের এই মতামত গ্রহণযোগ্য এবং উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
অধ্যাপক লরেন্স ট্রাইব এবং জে. মাইকেল লুটিগের যুক্তি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ১৪তম সংশোধনীর একটি অনুচ্ছেদকে কেন্দ্র করে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ যদি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে শপথ নিয়ে বিদ্রোহ করেন বা বিদ্রোহে জড়িত থাকেন বা সরকারের শত্রুকে সহায়তা করেন তাহলে তিনি পরবর্তী সময়ে সরকারি অফিসে বসার যোগ্য হবেন না। এই জুটি লিখেছেন :‘আমাদের পেশাগত কর্মজীবনের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চতুর্দশ সংশোধনীর অযোগ্যতার ধারার পাঠ্য, ইতিহাস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে দীর্ঘ এবং গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ হয়েছে। আমরা দুই জনেই কয়েক বছর আগে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে, প্রকৃতপক্ষে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা এক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে। সাবেক প্রেসিডেন্টের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে উলটে দেওয়ার প্রচেষ্টা, এর ফলে মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে আক্রমণ তাকে অযোগ্যতার ধারার আওতায় নিয়ে গেছে। তাই তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য।’
পেনসিলভেনিয়া ল রিভিউতেও একই মত
গত সপ্তাহে আইনি সংস্থা ফেডারেলিস্ট সোসাইটির দুই সদস্যও আইন পর্যালোচনা করে একটি নিবন্ধন প্রকাশ করেছেন। এই নিবন্ধন রক্ষণশীল আইনি চিন্তাবিদদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে। তাদের নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া ল রিভিউতে।
একই রকম যুক্তি তৈরি করে একটি আইন পর্যালোচনা নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। নিবন্ধটি লিখেছেন আইনের অধ্যাপক উইলিয়াম বাউড এবং মাইকেল স্টোকস পলসেন। তাদের মতে, সরকারি রেকর্ডের ভিত্তিতে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল উলটে দেওয়ার চেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে ৬ জানুয়ারির হামলার কারণে পুনরায় সাংবিধানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার যোগ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে অযোগ্য ঘোষণার অনুচ্ছেদটি অত্যন্ত শক্তিশালী। নিবন্ধে তারা লিখেছেন যে, ৬ জানুয়ারি ট্রাম্প যে বক্তব্য দিয়েছেন তা থেকেই উৎসাহিত হয়েই তার সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে হামলা চালিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে জনতাকে উৎসাহিত দিয়েছিলেন। তিনি বার্তাও পাঠিয়েছিলেন দাঙ্গায় জড়িতদের কাছে।
অধ্যাপক উইলিয়াম বাউড ও মাইকেল স্টোকস পলসেন আরও লিখেছেন যে, হোয়াইট হাউজে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান এবং সাবেক কেউ যদি ট্রাম্পের সঙ্গে নির্বাচনের ফলাফলকে উলটে দেওয়ার চেষ্টা সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তারা যদি ভবিষ্যতে নির্বাচন করতে চায় তাহলে তাদেরও নিষিদ্ধ করা উচিত। তাদের মতে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ারই অযোগ্য।
বাউড এবং পলসেন আরও উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্পের সামগ্রিক আচরণ একজন প্রার্থী হিসেবে তাকে অযোগ্য করে তোলে। নির্বিশেষে তিনি ২০২০ নির্বাচন সম্পর্কিত ফৌজদারি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত কি না, সেটা বা দেওয়ানি ষড়যন্ত্র মামলায় তাকে দায়ী করা হয়েছে কি না, সেটা কোনো বিষয় নয়। তাদের মতে, সরকারি রেকর্ড সত্যি হলে এবং মামলাটি বন্ধ না হলে তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার অযোগ্য হবেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের এই জুটি ১৪তম সংশোধনীর এই ধারার ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিকেও নজর দিয়েছেন, যা গৃহযুদ্ধের পরে কনফেডারেটদের আবার অফিসে অধিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়। কারণ তাদের অনুমতি দেওয়া হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কার্যকর পুনর্গঠনে কাজ করতে পারত না। রাজনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষাও সম্ভব হতো না এবং মুক্ত হওয়া দাসদেরও সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হতো না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকায় সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের জন্য ক্যাপিটল হিলের হামলাই ছিল সবচেয়ে গুরুতর হুমকি। তারা এই যুক্তিও দিয়েছেন যে, চার বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সূচনা ঘটে ১৮৬১ সালে। তখন কনফেডারেট বাহিনী ফোর্ট সামটারে আক্রমণ করে এবং অনেকে হতাহত হন। ঠিক তেমনি ক্যাপিটল হিলে হামলার সময়ও অনেকে হতাহত হন। ফলে কনফেডারেটদের মতো ট্রাম্পকেও নিষিদ্ধ করার সুযোগ আছে বলে তারা মনে করেন।
সিদ্ধান্ত নেবে আদালত
বিভিন্ন রাজ্য ট্রাম্পের প্রার্থিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। বিশেষ করে কোনো রাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেট বা অন্যান্য কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে রাজ্যের ব্যালটে ট্রাম্পকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে। তবে লুটিগ এবং ট্রাইব মনে করেন, ব্যালটে ট্রাম্প থাকবেন কি না, সেটা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। কারণ এই প্রক্রিয়া সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। এর আগে অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলো সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মেজোরি টেলর গ্রিন এবং ম্যাডিসন কাউথননের নাম যাতে ২০২২ সালের নির্বাচনে না থাকে, সেই চেষ্টা করেছিল। এমনকি ক্যাপিটল হামলায়ও তারা জোরালো সমর্থক ছিলেন। কিন্তু বিচারক তাদের কাউকেই অযোগ্য ঘোষণা করেননি। আবার ক্যাপিটল হামলায় জড়িত কাউই গ্রিফিনকে নিউ মেক্সিকোর কাউন্টি অফিস থেকে অপসারণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এক বিচারক। —সিএনএন