রুবলের বিপর্যয় প্রকাশ করে দিচ্ছে পুতিনের লুকিয়ে রাখা সত্য

আগস্টের অভিশাপ আবারও আঘাত হেনেছে রাশিয়ায়। একদিকে ব্যবহারযোগ্য শক্তি রপ্তানি থেকে রাজস্ব আয় যখন নিম্নগামী, আরেক দিকে জি-৭ দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে যখন ফাটল দেখা দিচ্ছে, ঠিক তখনই মুদ্রাসংকটে পড়েছে পুতিনের দেশ।

নভেম্বরে যখন থেকে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে রাশিয়ার যুদ্ধ শুধু একটি অখণ্ড ও সামরিকভাবে সক্ষম ইউক্রেনের বিরুদ্ধেই নয়; বরং পিছু হটতে নারাজ পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের বেঁধে দেওয়া তেলের মূল্যসীমার বিরুদ্ধে, তখন থেকে রুবলের মান কমেছে ৪০ শতাংশ। প্রিগোজিনের বিদ্রোহের পর থেকে রুবলের অবমূল্যায়নের গতি বেড়েছে। গত সপ্তাহে সংক্ষিপ্তভাবে ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক মান ছাড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার একটি জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ১২ শতাংশে উন্নীত করেছে। তবে এটি এখনো রুবলের ওপর আস্থা পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হতে যাচ্ছে এবং মুদ্রা হিসেবে রুবলের যাত্রাটাও খুব বেশি মসৃণ হবে না বলে মনে হচ্ছে।

‘রুবলের নিম্নগামী এক্সচেঞ্জ রেট দেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ’ শীর্ষক যে ভাষ্য পুতিন এত দিন প্রচার করেছেন, আগামী দিনগুলোতে তা আর সম্ভব হবে না। অথচ তিনি রাশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে গত বছর রুবল নিয়ে বেশ বড়াই করেছিলেন।

চ্যাথাম হাউজের টিম অ্যাশ বলেছেন, ‘অবমূল্যায়ন রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ প্রোপাগান্ডা কার্যক্রমের একটি বিপর্যয় এবং তেলের মূল্যসীমা ও নিষেধাজ্ঞাগুলোর কার্যকারিতার প্রমাণ।’ রাশিয়ার ব্যবহারযোগ্য পেপার কারেন্সি ফুরিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, রাশিয়ান এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠান এরোফ্লট তদের অন্তত ৯টি বোয়িং ও এয়ারবাস প্যাসেঞ্জার জেট অবতরণকালীন ব্রেক বন্ধ করে রাখছে। কারণ এয়ারলাইনসটি টেকসই খরচে বিমানের যন্ত্রাংশ পেতে হিমশিম খাচ্ছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে থাকা বিমানবহরগুলোর পরিষেবা নির্বিঘ্ন করতে পারছে না। বিমান অবতরণকালে এখন পাইলটদের শুধু রিভার্স-থ্রাস্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একটি ফাঁসকৃত মেমো থেকে জানা যায়, উল্লিখিত বিমানগুলোকে আর্দ্র আবহাওয়ার ফলে ‘রানওয়ে অতিক্রম করার’ ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। রাশিয়ার সামনে এখন ভয়াবহ সংকট। একমাত্র রাশিয়ার নিজের জাদুকরি পরিসংখ্যানেই দেশটির অর্থনীতিতে গত ত্রৈমাসিকে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধির কথা শোনা যায়।

চীনা সেমিকন্ডারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে রাশিয়া। পাশাপাশি ডিশওয়াশার ও ফ্রিজ থেকে সেমিকন্ডাক্টর বের করে সেগুলো ব্যবহার করছে। তবে এগুলো বেশির ভাগই ওয়ার্কহাউজ চিপ, যা উন্নত যুদ্ধের জন্য খুবই নিম্নমানের প্রযুক্তি বলে বিবেচিত। রাশিয়ার বিদ্যমান শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনা সার্কিটগুলো কনফিগার করতে কয়েক বছর সময় লাগবে এবং এখনো পর্যন্ত চীনা কোম্পানিগুলো তা করতে বেশ উদাসীন। ইউক্রেনে বন্দি বা গুলিবিদ্ধ যুদ্ধাস্ত্রগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মার্কিন চিপ রয়েছে, যা যুদ্ধের আগে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেগুলোর বিকল্প হিসেবে অস্ত্র জোগানের জন্য রাশিয়ার একটি বিস্তৃত চোরাচালান নেটওয়ার্ক রয়েছে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন হয় হার্ড কারেন্সি, যা পুতিনের কোষাগারে আগের মতো প্রতুল নয়।

রাশিয়া গত বছর এনার্জি, ধাতু ও শস্যের দাম বৃদ্ধি থেকে বেশ বড় মাপের রাজস্ব সুবিধা উপভোগ করেছে। রাজস্বের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল, জাতীয় উদ্বৃত্তের হিসাব জিডিপির ২০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে পুতিন একই সঙ্গে যুদ্ধের অর্থায়ন করতে এবং সামাজিক কল্যাণ চুক্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

ঐ উদ্বৃত্ত মূলত হাওয়া হয়ে গেছে। মি. অ্যাশ বলেন, ইউরোপে রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি গত বছরে মাসপ্রতি ১২ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছে। গ্যাজপ্রম প্রতিষ্ঠান ইউরোপে তাদের বার্ষিক ৬০ বিলিয়ন ইউরোর গ্যাস মার্কেট চিরতরে হারিয়েছে। পশ্চিম সাইবেরিয়ান গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাস পাইপলাইনগুলো বিশাল বিনিয়োগ ছাড়া চীনে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালের মাঝেও পুতিন রেকর্ড পরিমাণ তেল বিক্রি করছেন। ৬০ ডলারের তেলের ক্যাপের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতিকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা এবং ক্রেমলিনকে উপার্জনের একটি অংশ থেকে নিশ্চিতভাবে বঞ্চিত করা।

পথ এখন দুটি। পুতিনকে তেলের মূল্যসীমা মেনে নিয়ে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত যোগসূত্রে ট্যাংকার ও বিমার সুবিধা ভোগ করে তার তেল রপ্তানি করতে হবে, অথবা তাকে জিব্রাল্টার বা গ্রিক দ্বীপপুঞ্জ থেকে জটিল ও ব্যয়বহুল রিফুয়েলিংসহ তার নিজস্ব বহরের মাধ্যমে রপ্তানি চালিয়ে যেতে হবে। এশিয়ায় তেল রপ্তানি করতে সেক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ ডলার লোকসান হবে পুতিনের। ভারত ও চীন ভালোমতোই জানে যে পুতিন তার তেল বিক্রি করতে মরিয়া এবং এজন্যই তারা আরো বেশি দরকষাকষি করছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বলেছে, রাশিয়ান ইউরাল ক্রুড তেলের ওপর ডিসকাউন্ট সংকুচিত হয়েছে। জুলাই মাসে গড় দাম ছিল ৬৪ ডলার, কিন্তু তা সেই সময়ে ৮০ ডলারের কাছাকাছি থাকা ব্রেন্টের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। পরিবহন খরচ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পাওনা মেটানোর পর এর কতটা রাশিয়ায় পৌঁছায়, তা একটি প্রশ্ন বটে।

রাশিয়ার ডেটা আমরা যতটুকু বিশ্বাস করতে পারি, তা থেকে জানা যায় যে ক্রেমলিনের রাজস্ব বছরের প্রথমার্ধে ৪৭ শতাংশ কমে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যানেও বাজেট ঘাটতি বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের গতিতে চলছে। ক্রেমলিন বিদেশ থেকে ধার নিতে পারে না এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ডিপ বা লিকুইড বন্ডের একটি বাজারের অভাব রয়েছে। জি-৭ নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রায় ৩৩০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আটকে আছে। অবশিষ্ট ২৬০ বিলিয়ন সব লিকুইড অথবা অব্যবহারযোগ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমান করে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশ থেকে ২৫৩ বিলিয়ন মূলধন বেরিয়ে গেছে।

ক্রেমলিন এখন প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর ওপর অভিযান চালাচ্ছে, তাদের যুদ্ধের তহবিলে ‘স্বেচ্ছায়’ আর্থিক অনুদান দিতে বাধ্য করছে। রাশিয়ার ‘গুগল’ হিসেবে পরিচিত ইয়ানডেক্সের প্রতিষ্ঠাতা, টেলিকম কোম্পানি ভিম্পেলকম এবং ডিজিটাল ব্যাংক টিংকফকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে, তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বা সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে।

এখন পুতিন পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেছেন। ড্যানোন, কার্লসবার্গ, ফোরাম ও ইউনিপারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, তার রাজনৈতিক অনুগতদের পৃষ্ঠপোষকতা বিতরণ করা এবং তার শাসনব্যবস্থার জন্য আর্থিক জোগান দেওয়া। যেসব প্রতিষ্ঠান দেশ ছেড়ে যাচ্ছে, তাদের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ ছাড়ে তাদের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং এরপর তাদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ কর আদায় করে তবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে। রোজনেফট প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ হোল্ডিং বন্ধ করতে খরচ হয়েছে ২৪ বিলিয়ন।

এ ধরনের স্ক্যাভেঞ্জিং দিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করার তার সীমায় পৌঁছেছে। তেল রপ্তানি থেকে নামমাত্র রুবলের রাজস্ব বাড়লেও সেই প্রভাব বেশ দ্রুতই মুদ্রাস্ফীতির কারণে চাপা পড়ে যায়। রাশিয়ার কোষাগারকে জাতীয় কল্যাণ তহবিলেও হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। মে মাস থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার কমিয়ে ১৪৬ বিলিয়ন ডলার করা হয়েছে, যার সম্পূর্ণটা লিকুইড নয়। জ্বালানি রাজস্বের একটি অংশ বিদেশি সম্পদগুলোতে জামানত রাখার বাজেট নিয়মটি ক্রেমলিন স্থগিত করেছে। এই পদক্ষেপও রুবলকে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে।

রাশিয়া এখন একটি চিরাচরিত উদীয়মান বাজারসংকটে আটকা পড়েছে। পুতিনের অনুগতরা যতই সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রধান এলভিরা নাবিউলিনাকে বলির পাঁঠা বানাতে চাক, দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের দুষ্টচক্র ততই প্রকট হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ছে। বলাই বাহুল্য, এই নাবিউলিনাই এত কিছুর পরেও রাশিয়ার অর্থনীতি জিইয়ে রাখার নেপথ্যে থাকা টেকনোক্র্যাট। এরপর যখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাবে, তখন আইএমএফের বেল-আউটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণেরও কোনো উপায় থাকবে না।

পুতিনের জন্য এই পরিস্থিতি চূড়ান্ত না-ও হতে পারে। তবে ইউক্রেনে সময় যে তার পক্ষেই থাকে, এই বহুল প্রচলিত ধারণা বর্তমান রুবল-সংকটের মাধ্যমে ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। তিনি তার শাসনের অধীনে থাকা কঠোর ব্যাবসায়িক স্বার্থান্বেষী ও ব্যক্তিগত মিলিশিয়াদের কেনার জন্য লুণ্ঠন করার মতো আর কিছু বাকি রাখছেন না।

এই পত্রিকার একজন পাঠক পরামর্শ দিয়েছিলেন যে পশ্চিমের উচিত রাশিয়ান অলিগার্চদের (অভিজাতশ্রেণি) আক্রমণ করার পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা; অবশ্যই যারা সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে সহায়তা করছে, তারা বাদে। তাদের সম্পদ আটক হবে না—এই নিশ্চয়তা দিয়ে জুরিখ, লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে যতটা সম্ভব অর্থ আনতে উত্সাহিত করা উচিত।

আমি এখানে একমত। এই মুহূর্তে দরকার হলো রাশিয়ান অলিগার্কদের বিভক্ত করা এবং মূলধনগুলো রাশিয়ার বাইরে নিয়ে আসা। এতে রুবলের ওপর যে আঘাত পড়বে, তা স্টর্ম শ্যাডো মিসাইলের আর্থিক সমতুল্য।  

লেখক: দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিকের সম্পাদক

ভাষান্তর: সোয়াদেকীন রিশান