রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—সহজ কথা যায় না বলা সহজে। আমরাও সহজ কিছু বলতে চাই; কিন্তু কথাগুলো খুব সহজে বলা যায় না কিংবা বলা হয় না এবং বলতে না পারার কিছু বাধা তো রয়েছেই। পৃথিবীতে সবচেয়ে জঘন্যতম এবং প্রশান্তির শব্দ হচ্ছে ‘কথা’ বা ‘উক্তি’। ভালো ‘উক্তি’তে যেমন বিশ্ব জয় করা যায় তেমনি ‘কটূক্তি’তে ঘটে যত বিপত্তি। তবে কোন উক্তিটি কোথায় কেমন ব্যক্তি বা দেশের কাছে কটূক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সেটিই আলোচ্য বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ সহজলভ্যতা এখন উক্তি ও কটূক্তির মধ্যকার বিভেদকে আরো বেশি স্পর্শকাতর এবং প্রতিহিংসামূলক করে তুলেছে। সারা বিশ্ব এখন ‘কটূক্তি’ দমনের জন্য অতিমাত্রায় তত্পর হয়ে উঠেছে। আর এ যাত্রায় পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। তৈরি করেছে আইন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কথাই বলছি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে এই আইনটি পাশ করে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কতটা কঠোর হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর বিপক্ষে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে এবং যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রস্তাবনা তুলে ধরে তা ভাববার বিষয়। সরকারের এই শুভ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি এমন করে সাজানো হয়েছিল যে কোনো সময় প্রতিহিংসামূলক প্রতিপক্ষকে এই আইনের আওতায় ফেলে দেওয়া যায়। ভয় দেখানো যায়। অথবা ভয়ে রাখা যায়। বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তা প্রায় হুবহু প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনেও রাখা হয়েছে। দুটি আইনের বিষয়বস্তুও প্রায় একই রকম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের যেসব আপত্তি-উদ্বেগ ছিল, প্রস্তাবিত নতুন আইনেও সেসব দূর করা হয়নি। শুধু কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো হয়েছে এবং জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হয়েছে। এবং মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের অপরাধের (প্রমাণিত হলে) ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে শুধু জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারা (২১ ও ২৮) বাতিলের কথা বলেছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংগঠন। ২১ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার জন্য দণ্ডের বিধান রয়েছে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। প্রস্তাবিত আইনে সাজা কমিয়ে সাত বছর করা হয়েছে। তবে অর্থদণ্ড আগের মতোই ১ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এই অপরাধ দ্বিতীয় বার বা বারবার করলে শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন বা ৩ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। প্রস্তাবিত আইনে এটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮ ধারায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাতসংক্রান্ত বিষয় নতুন আইনে একই রয়েছে। এই ধারায় অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড কমিয়ে দুই বছর বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কমিয়ে ৫ লাখ টাকা বা উভয় দণ্ড হবে—এমন প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত পাঠানো, প্রকাশ ইত্যাদি অপরাধের বিষয়ে বলা আছে—কোনো ব্যক্তি এই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে বিষয়বস্তু একই রেখে সাজা কমিয়ে দুই বছর করা হয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ পরিবর্তন করা হয়নি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। প্রস্তাবিত নতুন আইনে এই অপরাধের জন্য কারাদণ্ডের বিধান বাদ দিয়ে শুধু জরিমানার শাস্তি রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছিল ৫ লাখ টাকা।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো বা ঘটার উপক্রম-সংক্রান্ত অপরাধের কথা রয়েছে। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড রয়েছে। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে এই সাজা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। আর অর্থদণ্ড বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে কারাদণ্ড সর্বোচ্চ সাত বছর বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের এই সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের আইন বর্তমানে কতটা সময়োপযোগী তা ভেবে দেখার বিষয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ৮-এর বিষয়বস্তু প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনেও হুবহু রাখা হয়েছে। এই আইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৪৩ ধারা প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে (খসড়ায় ৪২ ধারা) বিষয়বস্তু ও সাজার বিষয়টি হুবহু এক রাখা হয়েছে। পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতারসংক্রান্ত এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন যে, কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বা সাক্ষ্যপ্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছে ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হওয়ার বা করার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে ঐ কর্মকর্তা বিশ্বাসের কারণ লিখে ঐ স্থানে প্রবেশ করে তল্লাশি এবং প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
এ ছাড়া ঐ স্থানে তল্লাশিকালে পাওয়া অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দ করতে পারবেন। এমনকি ঐ স্থানে উপস্থিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি, সন্দেহ হলে গ্রেফতার করতে পারবেন। এই আইনের মাধ্যমে পুলিশকে কার্যত একধরনের ‘বিচারিক ক্ষমতা’ দেওয়া হয়েছে, ফলে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে পুলিশ ধরাকে সরা জ্ঞান করবে এটাই ধরে নেওয়া যায়। যথেষ্ট প্রমাণ এবং পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেফতার করা যাবে না—এই মর্মে প্রস্তাবিত আইনে সংশোধনী আনা প্রয়োজন।
প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। ব্যক্তিগত দর্শন থেকে যে কেউ তার মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার রাখে। এখন কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি তার মত প্রকাশ করে তা সমাজের প্রতিটি মানুষের মতাদর্শের সঙ্গে মিল না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতার কারণে কারো লেখা অন্যের অপছন্দ অথবা ঘৃণার কারণ হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা—কারো লেখায় ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে কি না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে কি না, কিংবা সমাজে অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সম্ভাবনা আছে কি না—তা কে নির্ণয় করবে? দেশের সরকার, প্রশাসন।
তবে এ কথাও অনস্বীকার্য, সামাজিক মাধ্যমে গুজব, ভুয়া তথ্য, মিথ্যা প্রচার, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানহানিকর স্ট্যাটাস এবং ধর্মীয় অপপ্রচারের মাধ্যমে নিজ ধর্মের ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে উসকানি ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কটূক্তি করতে দেখা যায়। এসব অপকর্ম দমনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শৃঙ্খলা আনতে আইনের প্রয়োজন। তবে সে আইন হতে হবে সমাজ ও মানববান্ধব এবং গ্রহণযোগ্য।
সরকারের সাইবার আইনের প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়ে বলতে চাই—এই আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে সংশোধন করে প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। তবে আইন ও নীতিমালার খসড়া তৈরিতে মানবাধিকারকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা দিয়েছে আমাদের সংবিধান। এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তিও বটে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মত প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে অস্বচ্ছ ও নিবর্তনমূলক ধারাগুলোর সংশোধন না হলে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত থাকবে। তাই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দমনে মামলার বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ধারা সাইবার নিরাপত্তা আইনে থাকা উচিত।
লেখক :সেক্রেটারি জেনারেল, পেন বাংলাদেশড