বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে যে অস্বাভাবিক উচ্চমাত্রায় মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকেই বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মাত্রায় মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে শুরু করে। বিশ্বের শীর্ষ সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার এক পর্যায়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, যা ছিল দেশটির অর্থনীতিতে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা গত এক বছরের মধ্যে তাদের পলিসি রেট অন্তত ১০ বার বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণে বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পলিসি রেট বাড়িয়েছে। এছাড়া আরো নানামুখী প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর ইকোনমিক স্যাংশন আরোপ করে। রাশিয়ার পালটা ব্যবস্থা হিসেবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সাপ্লাই চেইন অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলিতভাবে বিশ্বের মোট দানাদার খাদ্য পণ্যের ৩০ শতাংশ উত্পাদন করে। রাশিয়া বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-দশমাংশ উত্পাদন করে থাকে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রভাব প্রকটভাবে অনুভূত হয়। মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আপনা-আপনিই এসে যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তা আলোচনার অবকাশ রাখে। উল্লেখ্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি একটি বা দুটি কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে না। সরকার, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ব্যাবসায়িক সংগঠন, ব্যাবসায়ীবৃন্দ সবার সদিচ্ছার ওপর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নির্ভর করে। দেশে বড় যেসব কোম্পানি আছে তাদের ইতিবাচক ভূমিকাও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে বেশ কিছু বৃহত্ ও প্রভাবশালী কোম্পানি আছে, যারা বিভিন্নভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আগে আমাদের দেশে বেশির ভাগ পণ্যই পাইকারি ও খুচরো পর্যায়ে বিক্রি হতো। উত্পাদকরাই এসব পণ্য বিক্রি করতেন। এখন বড় কোম্পানিগুলো উত্পাদকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে নিজস্ব মোড়কে বাজারজাত করে থাকে। তারা ইচ্ছে করলেই এসব পণ্যের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারে। অর্থাত্ বাজার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভোজ্য তেল বিক্রি করে তারা পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। কিছু দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ অডিবল ওয়েল অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় বসে ভোজ্য তেলের সর্বোচ্চ মূল্য কীভাবে সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় তার উদ্যোগ নিয়েছিল। আমি একজন এক্সপার্ট হিসেবে এই কমিটিতে যুক্ত ছিলাম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোজ্য তেলের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ তাদের কথা রাখেননি। আলোচনার কিছু দিনের মধ্যেই প্রতি লিটার ভোজ্য তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়। এক পর্যায়ে ভোজ্য তেলের বাজার পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা যুক্তি দেখান যে, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি কারণে তাদের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে আগের তুলনায় বেশি অর্থব্যয় হচ্ছে। কাজেই নতুন ভাবে আমদানিকৃত ভোজ্য তেল আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারব না। আগে যেগুলো আমদানি করা ছিল সেই তেল হয়তো তুলনামূলক কম মূল্যে বিক্রি করতে পারব। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শক্ত অবস্থানে থাকলেও ব্যবসায়ীদের যুক্তির বিপরীতে তেমন কিছু করতে পারেনি।
অভ্যন্তরীণ বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির নানা কারণ থাকতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার চাহিদা ও জোগানের ওপর ভিত্তি করে পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে বাজার ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। এজন্য বাজারে ক্রিয়াশীল সিন্ডিকেটকে দায়ী করা যায়। বাজারে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট তত্পর রয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষে অনেক সময়ই এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। সরকার হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে তত্পর সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করে না; কিন্তু অনানুষ্ঠানিক বা পরোক্ষভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ বাজারে যে সিন্ডিকেট তত্পর রয়েছে তা স্বীকার করেন।
সরকার উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ে বেশ উত্কণ্ঠার মধ্যে আছেন। তারা চেষ্টা করছেন কীভাবে মূল্যস্ফীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় নামিয়ে আনা যায়। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অংশীদার সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, মার্কেটিং পলিসি কীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? আমাদের দেশে যথেষ্ট ভালো মার্কেটিং পলিসি আছে; কিন্তু তা সঠিকভাবে কাজ করছে না। কাগজে কলমে একধরনের মার্কেটিং পলিসি থাকে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চিন্তাভাবনা তো ভিন্ন রকমের। বড় বড় কোম্পানি চাল প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছে। তারা নিজেরাই এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে বাজারে এসব পণ্য কী দামে বিক্রি হবে, এটা কোম্পানির নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোম্পানির মূল্য উদ্দেশ্য থাকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের বিবেচনায় থাকে না। কোম্পানির পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের তেমন কোনো ভূমিকা থাকে না। খোলা বাজারে যেসব পণ্য বিক্রি হয় সরকার সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কিন্তু সেখানেও মধ্যস্বত্বভোগীর ব্যাপার থাকে। আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায়ের উত্পাদকগণ পণ্যের সঠিক মূল্য পান না। ভোক্তাও সঠিক মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে পারেন না। বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-এর মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে ভোক্তাদের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। যখন কোনো আমদানি পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস সুবিধা দিয়ে থাকে। এতে সরকারের রাজস্ব কমে গেলেও জনগণের কথা বিবেচনা করে এটা করা হয়। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পেঁয়াজ বা এ ধরনের কোনো কোনো পণ্যের মূল্য যখন অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হয় তখন সরকার সংশ্লিষ্ট পণ্যটি আমদানির সুযোগ করে দেন। এতে পণ্যটির মূল্য দ্রুত কমে যায়। তার মানে হচ্ছে, এই মূল্যবৃদ্ধিটা স্বাভাবিক ছিল না।
আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, শুধু আইন দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এজন্য আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে অস্বাভাবিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল অনেকটাই সাময়িক ব্যাপার মাত্র। যুক্তরাজ্যে যখন উচ্চ মাত্রায় মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় তখন তারা দেশের মানুষকে সচেতন করে। সরকার জনগণকে পণ্যক্রয় কমিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। ভোক্তাগণ সরকারের এই পরামর্শ মেনে নিয়েছে। এছাড়া আরো কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে যুক্তরাজ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। আমাদের দেশে এর বিপরীত অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। কোনো সময় সংকট সৃষ্টি হলে কিছু মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় করে সংরক্ষণ করেন। এদের এই প্রবণতা বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বিক্রেতাগণ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করে। যখন বাজারে ভোজ্য তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেল, আমি তখন তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছিলাম। যখন কাঁচা মারিচের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল, আমি কাঁচা মরিচ কেনা কমিয়ে দিলাম। আমার মতো সব ভোক্তাই যদি এমন আচরণ করতেন, তাহলে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য এতটা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা নয়। শুধু সরকার ও ব্যবসায়ীরা পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করবে তা কিন্তু নয় আমরা যারা ভোক্তা তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা কখনোই আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের বেশি পণ্যক্রয় করব না এ ধরনের অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন এগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হলেও এগুলো না খেলে মানুষ মরে যাবে না। তাই কোনো সংকট সৃষ্টি হলে আমরা এসব পণ্য কেনা কমিয়ে দিতে পারি। একই সঙ্গে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। বিক্রেতা ও ভোক্তার মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শুধু আইন প্রয়োগ করে এই উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো বড়ই কষ্টে আছে। এদের প্রতি আমাদের সহানুভূতিশীল হতে হবে। উন্নত দেশগুলো আইন খুবই কঠোর এবং তার প্রয়োগ হয় যথাযথভাবে। আর জনগণের মানসিকতাও আমাদের দেশের মানুষের চেয়ে উন্নত। কাজেই তারা যে কোনো সমস্যা সহজেই মোকাবিলা করতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন: এম এ খালেক