ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নেই কার্যকর পদক্ষেপ

দেশে নীরব ঘাতক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নেই কার্যকর পদক্ষেপ। এ কারণে ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের নামে বলতে গেলে তামাশা চলছে। 

দায়িত্বশীল বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমে আসছে, মৃত্যুও কমছে। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। রাজধানীর কোনো সরকারি হাসপাতালে সিট খালি নেই। মেঝে ও সিঁড়িতে রেখেও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীদের নিয়ে অনুরূপ অবস্থা, সেখানেও কোনো সিট খালি নেই। শুধু রাজধানী নয়, ঢাকার বাইরে সারা দশে ইউনিয়ন-গ্রাম পর্যায়েও ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। 

Dengue Ward

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ থেকে আরও ভয়াবহ হবে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতির এতই অবনতি হবে যে, আগামী ৩০ বছরেও তা সামাল দেওয়া যাবে না। অনেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল, তারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে নানারকম জটিলতায় ভুগছে বেশি। কারণ বিশেষজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার প্রভাব দুই বছর পর্যন্ত থাকবে। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে বিভিন্ন জটিলতা কিংবা টাইফয়েডে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। কিছু বোঝার আগেই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা মারা যাচ্ছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মারার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। সঠিক সময়ে মশা মারা হচ্ছে কি না, সেটাও মনিটর করা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনার বিন্দুমাত্র বালাই নেই। অর্থাৎ মশা মারার নামে হযবরল অবস্থা চলছে।

dengue-20220926140035

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ১৯৬০ সালে সিঙ্গাপুরে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। দেশটি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনা প্রয়োগের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এনেছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশ সঠিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এনেছে। পৃথিবী যতদিন থাকবে, ততদিন মশা থাকবে। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ উলটো পথে চলছে। আগে মশা মারার দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাদের কীটতত্ত্ববিদসহ প্রশিক্ষিত জনবল আছে। কিন্তু পরে মশা মারার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের কাছে। বর্তমানে তারা দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তাই আবার মশা মারার দায়িত্ব নিরসনের ওপর দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, মশা মারার জন্য বর্তমান অবস্থা চালু থাকলে আগামী ৩০ বছরেও তা নিয়ন্ত্রণে আসবে না। শুধু তাই নয়, সামনে ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে। ইতিমধ্যে শুধু ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতেই  ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মশা নিয়ন্ত্রণে না এলে অন্য রোগীদের আর চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়। সারা বছরই ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।  

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এমিরেটস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, অযথা কথা বলে লাভ নেই, মশা মারার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু মশা মারার সঠিক পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পদ্ধতি প্রয়োগ করে ধাপে ধাপে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ এখনই হাসপাতালগুলোতে রোগী বাড়ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনে বিপদ। তাই রোগী যাতে আর না বাড়ে সেজন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এটার সমাধান সম্ভব না। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য রোগব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। তাই জ্বর হলে বিলম্ব না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। 

Dengue

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, একজনকে বলতে শুনলাম ডেঙ্গু নাকি নিয়ন্ত্রণে। এটা ঠিক না। এই রোগটি নিয়ন্ত্রণে মনে হলেও হঠাৎ আবার দ্রুত বাড়বে। কারণ দেশে এডিস মশা আছে। তাই নিয়ন্ত্রণে বলা যাবে না। আগে ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল ডেঙ্গু। কিন্তু এখন সারা দেশে সমান হারে ছড়িয়ে পড়েছে এই রোগ। তাই গায়ের জোরে কথা বলা যাবে না। মশা মারার সঠিক নীতিমালা লাগবে। কিন্তু সেই নীতিমালা নেই। মনে রাখতে হবে পৃথিবী যতদিন থাকবে, ততদিন ডেঙ্গু থাকবে। তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পদ্ধতি প্রয়োগ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। গবেষণা ও পর্যালোচনা করে স্থায়ীভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নইলে দিনদিন সমস্যা বাড়তেই থাকবে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। 

নিপসনের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. মো. গোলাম সারোয়ার বলেন, দেশে মশা মারার সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। ওষুধের প্রয়োগ, সঠিক সময় ও প্রশিক্ষিত জনবল—এই তিনটি ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ব্যবস্থাপনায় থাকতে হবে। তাহলেই মশা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। নইলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে।

Dengue

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিভি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও অনেকে সুস্থতা অনুভব করেন। এ কারণে অবহেলা করেন। পরে দেখা যায় তাদের শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়, অনেকে টাইফয়েডেও আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ধরনের রোগীরা পরবর্তীকালে বিলম্বে ডাক্তারের কাছে আসার কারণে তার জটিলতা বাড়ার পাশাপাশি প্লাটিলেটও কমে যায়। এই অবস্থায় পতিত হয়ে শিশুরা বেশি মারা যাচ্ছে। তাই এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। 

এদিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ১ হাজার ৯৬০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, মারা গেছে ৯ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১ হাজার ১২৭ জনই ঢাকার বাইরের, যা মোট শনাক্তের ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৬৯৫ জন। আর এ বছর শনিবার সকাল পর্যন্ত মোট রোগী ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১৮৪ জন। ঢাকা নগরীর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৩ হাজার ৪৮৯ জন।  শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মোট ৫৩৭ জনের মৃত্যু হলো। হাসপাতালে ভর্তি রোগী এবং মৃত্যুর এ সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।