জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী

‘মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ আছে শুধু প্রাণ’

গতকাল ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই উপলক্ষ্যে বিশ্বমানবতার-বিশ্বমানের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নানা অনুষ্ঠান ও আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়েছে। তিনি মাত্র ২২ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও কাব্যজগতে রেখে গেছেন এক অভূতপূর্ব সৃষ্টিসম্ভার। তার সৃষ্টিসম্ভারের পরতে পরতে রয়েছে জীবন ও মরণের অমৃত নির্যাস। একদিকে রয়েছে জীবনকে সুষ্ঠু পরিচালনার বাণী অন্যদিকে মৃত্যুকে আলিঙ্গনের বাণী। তিনি মাত্র ৪২ বছর সুস্থ ছিলেন। অর্থাত্ পরিণত বয়স তিনি পাননি। এরই মধ্যে তিনি জীবনের সব বোধকে আত্মস্থ করেছিলেন। এটি কি সাধারণের জন্য সম্ভব?

২১ বছরের যুবক কীভাবে এক রাতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন?  কে ছিলেন তিনি, যিনি ধূমকেতুর মতো এসে আবার মিলিয়ে গেলেন সহসা। স্রষ্টার কতটা সযত্নে গড়া ছিলেন তিনি! আবার স্রষ্টা তার ভরা তরিকে ভরাডুবি করে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘ ৩৪টি বছর। যাকে দেখে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে প্রতিটি বাঙালি। তার সুস্থ ৪২টি বছর, কতটা ভালো কেটেছিল! দুঃখ-দারিদ্র্য, ব্রিটিশ নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতার কতটা কটাক্ষ, লেখক সম্প্রদায়ের হীনম্মন্যতার কশাঘাত। কী ঘটেনি! এত কিছুর পরও কবি তার অফুরান প্রাণশক্তিকে চিরোজ্জীবিত করে লিখেছেন ‘হে দরিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান’ মহানুভবতার সূত্রটি কি বিস্ময়কর! সর্বসাধারণ মানুষ ‘দারিদ্র্য’কে অভিশাপ বলে আখ্যায়িত করেন। লক্ষণীয় মহান মানুষের কাছে জীবনের প্রতিটি বাস্তবতা একেকটি মহান শিক্ষা, স্রষ্টা সে অলৌকিক জ্ঞান দিয়েই তাদের পৃথিবীতে পাঠান।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তার বিখ্যাত গান ‘মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ, আছে শুধু প্রাণ’ গানটি রচনা করেন। অর্থাত্ তার বয়স তখন ৪০। এ গানের বাণী পাঠ করলে অতি সহজে বোঝা যায় যে, তিনি মৃত্যুকে জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মৃত্যু ভয় তো ছিলই না বরং তার মধ্য খুঁজে পেয়েছিলেন অফুরন্ত প্রাণ। তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ,/ আছে শুধু প্রাণ/ অনন্ত আনন্দ হাসি অফুরান।’

মৃত্যু মানবজীবনের একটি অত্যন্ত করুণতম কষ্টকর অধ্যায়, যা মানুষের জন্য একেবারেই কাম্য থাকে না।  এ অধ্যায়টিকে সাবলীলভাবে গ্রহণ করে নেওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এই জীবন পরিসমাপ্তিকে কেউ গ্রহণ করতে চায় না। জগত্সংসারে সুফি সাধনার চারটি পথপরিক্রমার কথা সবাই কমবেশি জানি, কিন্তু তা আত্মস্থ করতে পারে কয় জনা। তা বোঝাও কষ্টসাধ্য। চারটি পথপরিক্রমায় পাওয়া যায়।  ১) শরীয়ত;  ২) তরিকত;  ৩) হাকিকত;  ৪) মারিফত। যেমন— ১) শরিয়ত : ইসলামের পূর্ণ বিধিবিধান মেনে আত্মাকে আনুগত্যে আনা। ২) তরিকত : সব পাপাচার বন্ধ করা। ৩) হাকিকত : ওপরের দুটি অর্জনের পর অন্তরে আল্লাহর নূর তৈরি হওয়া। ৪) মারিফত : অন্তরের নূর দ্বারা স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। ফেরেশতাকে উত্তীর্ণ করে মনের ও সৃষ্ট জীবনের গুপ্তরহস্য তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠা। এ সবগুলোই একটি আরেকটির পরিপূরক। এই পথপরিক্রমার ধাপগুলোর কোন ধাপে কবি ছিলেন, তা বলা কঠিন, তবে তিনি যে উচ্চস্তরে সমাসীন ছিলেন তার প্রমাণ তার সৃষ্টির মধ্যেই পাওয়া যায়। বাকরুদ্ধ হওয়ার ঠিক দুই-তিন বছর আগে লিখে গেছেন জীবনাবসানের গান, কবিতা, স্রষ্টার সঙ্গে মিলনের আনন্দবাণী। যার মর্মবাণী পাওয়া যায় ‘যেদিন রোজ হাশরে করতে বিচার’ গানটিতে কবি লিখেছেন, ‘হে খোদা বিচার করার ছলে তুমি যে শেষ বিচারে দেখা দেবে,  সেই দর্শন যে পাবে তাকে কি কখনো দোজখের আগুন ছুঁতে পারবে?’ এই অধিকার কখন আসে কতটা ‘ফানাফিল্লা’ হলে সেটি সম্ভব। স্বল্পদীর্ঘ জীবনাবসনের মাধ্যমে নতুন ভোরের সুপ্রশান্ত, শান্তসুন্দর ভোরের আলোর হাতছানি তিনি দেখতে পেয়েছেন।

স্রষ্টার যারা খুব প্রিয় তাদের জন্য পৃথিবী একটি কঠিন পরীক্ষাগার। এর সর্বোত্কৃষ্ট প্রমাণ আমাদের বিশ্বনবি হজরত মুহম্মদ (স.)। কবি নজরুল বিশ্বনবির গভীর প্রেমিক ছিলেন, তাকে নিয়ে রচনা করেছেন অজস্র গান ও কবিতা। তিনি লিখেছেন ‘তোমার নামের একি নেশা, হে প্রিয় হজরত, যত চাহি তত কাঁদি, মেটে না হসরত (আকাঙ্ক্ষা) আবার লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ মোর নয়ন মণি, মোহাম্মদ নাম জপমালা’, ‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ, এই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবি হজরত’, ‘ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদায়ী কালাম’। খোদার কাছে পৌঁছানোর বিশ্বাস কতটা দৃঢ় ছিল, তিনি লিখেছেন ‘ঐ নামেরি রশি ধরে যাই আল্লার পথে’, ‘ঐ নামের বাতি জ্বেলে দেখি আরশের মোকাম (আবাস, আস্তানা)। আবার লিখেছেন ‘রসুল নামের রশি ধরে যেতে হবে খোদার ঘরে’ অর্থাত্ নবিজির শাফায়েত বিনা কেউ ত্বরান্বিত হতে পারবে না।

গানে গানে কবি তার সমস্ত সত্তাভরে  উপলব্ধির বাণী প্রকাশ করে গেছেন, যা যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে, বাঙালির অস্তিত্ব থাকবে এ ধারা চলবে। এটিও তার জন্য একটি বড় সাদাকা বটে। তার প্রস্থান দিবসে তার আত্মা প্রশান্তিতে ভরা থাক—এই কামনা রইল। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ৪১ বছরের, সে সময় তিনি মৃত্যুর পরবর্তী সমাধান দিয়ে গেলেন গানে গানে—‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’। যদি প্রশ্ন করা হয় কেন? তিনি লিখেছেন, ‘যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জেনের আজান শুনতে পাই’ আজানের ধ্বনির প্রতি কী তৃষ্ণা, কী গভীর প্রেম স্রষ্টার প্রতি! গানটি এইচএমভিতে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে মো. কাসেম কণ্ঠ দেন, সুর করেছিলেন কবি নিজেই।

তার সে মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে ভাবতে সত্যি ভালো লাগে। বহু বাসনার প্রাপ্তিবঞ্চিত কবির সর্বশেষ বাসনা পূর্ণতা পেয়েছে। করুণাময় আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে দাখিল করুন। আমিন।

লেখক: নজরুল সংগীত শিল্পী ও অধ্যাপক, সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়