অভ্যুত্থানের দুষ্টচক্র থেকে পশ্চিম আফ্রিকা কি বের হতে পারবে?

নাইজারে ২৬ জুলাই রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। আটক হয়েছেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বাজুম। তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। দেশটির আইন অনুসারে বিচারে তার মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। পশ্চিম আফ্রিকায় হাতে গোনা যে কয়টি দেশে গণতন্ত্র আছে, তার মধ্যে নাইজার ছিল একটি। ১৯৬০ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বাজুম ছিলেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট।

সামরিক অভ্যুত্থান যে নাইজারে শুধু গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাই বাধাগ্রস্ত করেছে তা নয়, এর ফলে একসময় পশ্চিম আফ্রিকায় স্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে ওঠা দেশটি অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াল। বিভিন্ন জঙ্গি গ্রুপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাইজার ছিল পশ্চিমাদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিত্র। সেই পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতের দিকেই এগিয়ে চলেছে দেশটি। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আফ্রিকান যে কোনো উদ্যোগের পাশে থাকবে। পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে আলকায়েদা ও আইসিস ঘনিষ্ঠ গ্রুপগুলোর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে স্বাধীনতা লাভ করেছে। এরপর ঐ দেশগুলোতে সব মিলিয়ে দুই শতাধকি বার অভ্যুত্থান ঘটে। কোনোটি ছিল স্বল্পস্থায়ী, কোনোটি দীর্ঘস্থায়ী। সবশেষ সেখানে অভ্যুত্থান ঘটে বুরকিনা ফাসোতে ২০২২ সালে। অনেক সময় অভ্যুত্থান ঘটে আরেক জন সেনাশাসকের বিরুদ্ধে, আবার কখনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে। 

বলা যায়, অভ্যুত্থানের এক দুষ্টচক্রে পড়েছে ঐ অঞ্চল। অর্থনৈতিক সংকট, জনজীবনে দুর্ভোগ, অসামাঞ্জস্য বৈদেশিক বিনিয়োগ, ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি—সব মিলিয়ে সুশাসনের অনুপস্থিতিই সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দখল করতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু ক্ষমতা দখল করে সেনাশাসকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংকটগুলোর সন্তোষজনক সমাধান করতে পারে না। ফলে সেখানে বিদেশি শক্তিগুলো জেঁকে থাকতে পারে। মালি, বুরকিনা ফাসো আর নাইজার সাহেল অঞ্চলের এই তিন দেশেই বেশির ভাগ সময় সেনাশাসন এসেছে।

পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন আফ্রিকার বিশাল অংশ দীর্ঘকাল উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল। আফ্রিকার প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের আকর্ষণেই মূলত ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ছুটে এসেছিল। আধুনিককালে যেমন চীন ও রাশিয়ার নজর পড়েছে ঐ অঞ্চলের প্রতি। লক্ষ করলে সাম্প্রতিক তিনটি অভ্যুত্থানের নেপথ্যে রাশিয়ার হাত আছে। যেমন ২০২০ সালে মালি, ২০২২ সালে বুরকিনা ফাসো এবং চলতি বছর নাইজারে অভ্যুত্থানগুলো হয়। ওয়াগনারের মতো রুশ বেসরকারি সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি কলকাঠি নেড়েছে। 

উল্লেখ্য, জঙ্গিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মালিতে অনেক বছর ফরাসি সৈন্য ছিল। ফ্রান্সের অপারেশন বারখানের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ঐ অঞ্চলে একটি নিরাপত্তাশূন্যতার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে বলা যায়। আরো উল্লেখ করা যায়, গত শতকের শীতল যুদ্ধের সময় বিশ্ব যে দুটি শিবিরে ভাগ হয়েছিল, বর্তমানে আফ্রিকা ঠিক সেভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ছে। এই পক্ষের কাছে শান্তি ও স্থিতিশীলতার সংজ্ঞাও ভিন্ন।

পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলোতে কেন সময়ে সময়ে অভ্যুত্থান ঘটে, তার কিছু কারণ আগেই বলা হয়েছে। এগুলো মূলত অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধানে গণতন্ত্র জোরাল ভূমিকা রাখতে পারেনি। যদিও এই দেশগুলোতে গণতন্ত্রের ইতিহাস একেবার কম সময়ের নয়। নাইজারে ১৯৯৩ থেকে চলতি ২০২৩ পর্যন্ত ৩০ বছর গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। 

অন্যদিকে মালিতে ১৯৬৪ থেকে ২০১২ সালে তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের ক্ষমতা দখল পর্যন্ত ৪৮ বছর গণতন্ত্র ছিল। দীর্ঘ সময় গণতন্ত্র থাকলেও সেটা জনগণের মধ্যে আবেদন তৈরি করতে পারেনি। মালি ও নাইজারে শেষের দিকে যে নির্বাচন হয়, তাতে ভোটার উপস্থিতি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন না, অনেক সময় তাদের ভয়ভীতি দেখানো হতো। গণতন্ত্র ছিল নামমাত্রই। বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিও সাধারণ মানুষ আস্থা হারাতে বসেছিল। এসব কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলেও সাধারণ জনতাকে তা খুব বেশি ক্ষুব্ধ করে না। পশ্চিম আফ্রিকান দেশের জোট ইকোওয়াস ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো মহাদেশীয় জোটও আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এখনো পর্যন্ত তেমন কিছু করতে পারেনি।

স্বাধীনতা অর্জনের অনেক বছর পরও পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অবজল ও সাব সাহারান অঞ্চলের দেশগুলো অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে পারেনি। দেশগুলো বৈদেশিক সাহায্যের ওপর এখন ব্যাপক নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর সহায়তা ইকোয়াস ও আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্য দিয়েই সাধারণত ঐ দেশগুলো পেয়ে থাকে। যে কোনো অভ্যুত্থানের পর জোটগুলো সংশ্লিষ্ট দেশের সদস্যপদ স্থগিত করে থাকে। যেমন এবার নাইজারের সদস্যপদ স্থগিত হয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে সামরিক জান্তা চিন্তিত বলে মনে হয় না। কারণ তারা মনে করে, তাদের প্রতি জনগণের সমর্থন আছে। অর্থনৈতিক সংকট বাড়লে ভুক্তভোগী হবে জনগণ। কিন্তু জনগণ যদি ফুঁসে ওঠে, তবে সেটা জান্তার বিরুদ্ধে যাবে, নাকি বৈদেশিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। জান্তার ধারণা, জনগণ তাদের পক্ষেই থাকবে।