এমন মৃত্যুর তালিকায় প্রিগোজিন একা নন!

রাশিয়ায় ভাড়াটে যোদ্ধাদের সংগঠন ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহতের কয়েক দিন পার হলেও বিধ্বস্তের কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। ক্রেমলিনে গত দুই দশক ধরে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে প্রিগোজিন বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়টি রাশিয়ার ভেতরে এবং বাইরে নানা সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য ইঙ্গিত করেছে তারা এটাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে না। কারণ এর আগেও প্রেসিডেন্টের প্রতিপক্ষ, সমালোচক বা ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের হত্যা করেছে রাশিয়ান সিক্রেট সার্ভিস।

গত ২৩ জুন প্রিগোজিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে তার সৈন্যদের সীমান্তবর্তী শহর রোস্তভ-অন-ডন দখলে নিতে নির্দেশ দেন। তিনি তার দলকে নিয়ে মস্কো অভিমুখে যাত্রা করেন এবং তার দাবি ছিল প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের পদত্যাগ। যদিও বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর মধ্যস্থতায় এই বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেই সময় পুতিন এই বিদ্রোহকে একটা অভ্যুত্থানের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে জড়িতদের কঠোর শাস্তির ঘোষণা দেন।

ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন

সে বিদ্রোহের পর থেকে প্রিগোজিন রাশিয়ার ভেতরে এবং বাইরে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছিল, প্রিগোজিনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন পুতিন।  কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রিগোজিনের নিহত হওয়াকে অপ্রত্যাশিত বলা যায় না। কারণ পুতিন ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার অন্তত ২০ জন প্রতিপক্ষ, সমালোচক বা ‘বিশ্বাসঘাতক’ খুব অদ্ভুত উপায়ে রাশিয়ায় অথবা রাশিয়ার বাইরে মারা গেছেন। এদের মধ্যে একেবারে প্রথমদিকে মারা যাওয়াদের একজন ভ্লাদিমির গোলোভলিয়ভ, যাকে মস্কোর রাস্তায় কুকুর নিয়ে হাঁটার সময় গুলি করা হয়। এই আইনপ্রণেতা পুতিনকে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠা পর্যন্ত সমর্থন করেন।

কিন্তু এরপরই তার সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং তিনি পুতিনের সমালোচনা করতে থাকেন। এর এক বছরেরও কম সময় পর আরেক লিবারেল এমপি সের্গেই ইউশেঙ্কোভকে গুলি করা হয় মস্কোর রাস্তায়। ২০০৬ সালের ৭ অক্টোবর সাংবাদিক আনা পোলিতকোভস্কায়াকে হত্যা করা হয়। তিনি রাশিয়ান সংবাদমাধ্যম নোভায়া গ্যাজেটায় চেচনিয়ায় ক্রেমলিন বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার নিন্দা জানান। যদিও ২০১৪ সালে এই অপরাধে পাঁচ জন কথিত লেখককে দীর্ঘ কারাবাসে পাঠানো হয়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ কখনোই শনাক্ত করতে পারেনি যে খুনিদের কে ভাড়া করেছিল।

ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন

২০১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আরেকটি হত্যাকাণ্ডে সন্দেহ আরো জোরালো হয় যে, ক্রেমলিন কৌশলে তার প্রতিপক্ষদের সরিয়ে দিয়েছে। সেদিন সাবেক ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার বরিস নেমেতসভ খুন হন। যে জায়গাটিতে তাকে হত্যা করা হয় সেটি পুতিনের অফিস ভবনের খুব কাছে। তিনি পুতিনের কড়া সমালোচক ছিলেন। অন্তত তিন বার কারাগারে গিয়েছিলেন নেমেতসভ। নেমেতসভের হত্যাকারীরা চেচেন বাহিনীর নেতৃত্বের একটা অংশ রমজান কাদিরভের অনুসারী হলেও এই অপরাধের সঙ্গে পুতিনের মিত্র হিসেবে স্বীকৃত কাদিরভের সংশ্লিষ্টতা কখনোই তদন্ত করা হয়নি। ২০০০ সালের পর আরো ছয় জন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী যারা পুতিনের সমালোচনা করেছেন রাশিয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে।

তবে প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের মারা যাওয়ার এই তালিকা শুধু রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। যারা চলে গিয়েছিলেন এই ভেবে যে, রাশিয়ার বাইরে গেলে তারা নিরাপদ এমন অনেকেও আছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম সাবেক গুপ্তচর আলেক্সান্ডার লিতভিনেঙ্কো, যিনি ২০০৬ সালে নভেম্বরে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করে লন্ডন হাসপাতালে মারা যান। পরে এক তদন্তে জানা যায়, সাবেক এই গুপ্তচর পলোনিয়াম ২১০ এর বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন, যা খুবই উচ্চমাত্রার একটা রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ।

ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন

বেরেজোভস্কি হলেন দেশের বাইরে প্রাণ হারানোদের আরেক জন। ২০১৩ সালের মার্চে এই ব্যবসায়ীর মৃতদেহ পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বে তার নিজ বাড়ি সারেতে। ২০১৮ সালের মার্চে যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকা ভিন্নমতাবলম্বী আরেক রাশিয়ান মস্কোর দ্বারা হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সাবেক গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার মেয়ে ইউলিয়াকে এক রাশিয়ান এজেন্ট ইংলিশ শহর সালিসবুরিতে নভিচক বিষ প্রয়োগ করেন বলে জানা যায়। এই হামলার পেছনে লন্ডন রাশিয়ান ইন্টিলিজেন্সের দুই জন সদস্যকে শনাক্ত করে এবং মস্কোকে তাদের হস্তান্তর করতে বলে। কিন্তু রাশিয়ার সরকার এর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ অস্বীকার করে এবং লন্ডনের অনুরোধ নাকচ করে দেয়।