ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে

গতকাল ছিল ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকী (১ আগস্ট ১৯২৫—২৮ আগস্ট ১৯৮৩)। তিনি চাঁপুর জেলার সদর উপজেলাধীন রাঢ়িরচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক। এই আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তত্কালীন পূর্ব বাংলার একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। আন্দোলনে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে সক্রিয় ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, আব্দুর রশীদ খান তর্কবাগীশ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবদুল মতিন প্রমুখ। ছিলেন সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার বিশ্বস্ত সহচর এম এ ওয়াদুদসহ আরো অনেকে। ছাত্রাবস্তায়ই এম এ ওয়াদুদ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কাউন্সিলরদের ভোটে প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি দুই বার ঢাকা নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং একবার প্রাদেশিক ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার (১৯৫৬) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (১৯৪৯), সাপ্তাহিক ইত্তেফাক (১৯৪৯) ও দৈনিক ইত্তেফাক (১৯৫৩) প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি (১৯৫১) ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদেরও (১৯৫২) সদস্য ছিলেন। পাকিস্তানের জন্ম থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত এ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী সৈনিক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহচর।

এম এ ওয়াদুদ ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বের অভিযোগে ১৯৪৮, ১৯৫২ ও ১৯৫৪ সালে কারাবরণ করেছেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে তত্কালীন শাসকদের রুদ্ররোষের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন এবং একই বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হন। ঐ বছর (১৯৪৯ সালে) ভুখামিছিল আন্দোলনের কারণেও তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। জনাব ওয়াদুদ ইত্তেফাকে কর্মাধ্যক্ষ পদে চাকরির সুবাদে ভাষা আন্দোলনের সমস্ত রিপোর্ট নিয়মিত ইত্তেফাকে প্রকাশ করতেন। আর এ কারণেই তার ওপর স্বৈরাচারী পুলিশের অত্যাচার ও নিপীড়ন বেশি হতো। পুলিশি হানায় তার বাসা তছনছ ও ছিন্নভিন্ন করা হয় এবং ১০৪ ডিগ্রি জ্বর থাকা সত্ত্বেও তাকে সেদিন গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী আন্দোলনেও জনাব ওয়াদুদ বাংলা ভাষা প্রচলন ও একুশের চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫৩ সালে প্রথম শহিদ দিবস উদ্যাপনের শোভাযাত্রাটিও পরিচালনা করেন এম এ ওয়াদুদ। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের দুর্দিনেও তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহচর। ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক সরকার (১৯৭৮ সালে) তাকে মন্ত্রিত্বের লোভ দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। ফলে আবারও তাকে কারাবরণ করতে হয়। নিরহংকারী এই মানুষটির ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘একজন অমায়িক মানুষ ছিলেন ওয়াদুদ সাহেব। ছোটবেলা থেকেই তাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে চিনতাম। আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘আবদুল ওয়াদুদ ছিলেন সেই সব মানুষের একজন, যারা অন্তরের প্রেরণায় ও বিবেকের তাড়নায় নিরন্তর কাজ করে যেতেন, কিন্তু কোনো প্রতিদানের আশা করতেন না, এমনকি তার কাজের উপযুক্ত স্বীকৃতি মিলল কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন হতেন না।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘পঞ্চাশের দশকে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সেই ঝোড়ো উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার রাস্তায় রিকশার মধ্যে খাকি পোশাক পরা একজন মানুষকে টিনের চোঙা হাতে কোনো জনসভা বা প্রতিবাদ মিছিলের ঘোষণা প্রচারের কাজে দেখেননি এমন লোক তখন ছিল না বললেই চলে। এই মানুষটি এম এ ওয়াদুদ।’ গাফ্ফার চৌধুরী আরো লিখেছেন, ‘হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর যখন আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন নিয়ে দলের প্রবীণ ও নবীন অংশের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তখন ওয়াদুদ ভাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দলের পুনরুজ্জীবনের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। ছয় দফা উত্থাপনের সময়েও ওয়াদুদ ভাই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার একনিষ্ঠ সমর্থক।’

এম এ ওয়াদুদ দৈনিক ইত্তেফাকের জন্মলগ্ন থেকেই পত্রিকাটির প্রতিটি অগ্রযাত্রায় সক্রিয় ছিলেন। কর্মজীবনে ইত্তেফাক ছাড়াও ঈগল বক্স ও বাংলাদেশ পেপার মিলসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্টার পাটিক্যালসের পরিচালক পদেও কাজ করেন। ১৯৮৩ সালের ২৮ আগস্ট তিনি মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। পিতার আদর্শ অনুকরণ করেই দেশের জন্য কাজ করে চলেছেন তার সুযোগ্য কন্যা শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি (এমপি) এবং পুত্র ডায়াবেটিক ফুট সার্জারি ও শল্য চিকিত্সাক ডা. জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল এম এ ওয়াদুদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন এবং স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাকে ২০১৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলন ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে দেশ গঠনে তার অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। তাই তার কৃতকর্মকে স্মরণীয় রাখতে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় দান-খয়রাতসহ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এম এ ওয়াদুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রতি বছর আয়োজিত হয় জাতীয় বিতর্ক উত্সব। করোনাকালীন চাঁদপুরবাসীর করোনা টেস্টের সুবিধার্থে উক্ত ট্রাস্টের নামে মেডিক্যাল ল্যাব ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয় মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনির নিজস্ব অর্থায়নে। তার নামে নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রিজ, কালভার্ট, মসজিদ ইত্যাদি। অতি সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্থাপিত হতে যাচ্ছে ভাষাসৈনিক এম এ ওয়াদুদ পাঠকক্ষ। কিন্তু এগুলোই যথেষ্ট নয়। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার এমন একজন লড়াকু সৈনিকের বাড়ি চাঁদপুরে, এটা চাঁদপুরবাসীর জন্য যেমন গর্বের, তেমনি অহংকারের বিষয়। তাই একজন ভাষাবীর ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অবদান চিরস্মরণীয় করে রাখতে চাঁদপুরের একটি সড়ক কিংবা একটি এলাকাকে তার নামে নামকরণ করতে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। তারই সুযোগ্য কন্যা ডাক্তার দীপু মনি এমপি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর মেডিক্যাল কলেজটিকে ‘ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদ মেডিক্যাল কলেজ’ নামে নামকরণের দাবিও অনেক দিনের। শিক্ষামন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রমে সদ্য প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাস এই ভাষাবীরের নামে নামকরণ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি। মৃত্যুবার্ষিকীতে মহান এই ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদসহ সব ভাষাসৈনিকদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

n লেখক :অধ্যাপক ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়