যুগে যুগে কালে কালে খানদানি, আভিজাত্য বা স্ট্যাটাসের কারণে সমাজের একটি অংশকে সব সময় মানুষ একটু ভিন্ন চোখে দেখত। কোনোটা সম্মানের আবার কোনোটা ঘৃণার। যারা শিক্ষিত ও বুঝদার তারা অবশ্য সব সময় এমন বংশ, ব্যক্তি বা দলকে এড়িয়ে চলতেই বেশি পছন্দ করেন।
একটা সময় ছিল, যখন মানুষ স্যান্ডেল বা জুতা পায়ে দিতেন খুবই কম। স্রেফ অনুষ্ঠানে কেউ কেউ জুতা পরে যেতেন। যারা জুতা পরতেন ঐ ‘জুতা’ই ছিল তাদের আভিজাত্য। একসময় জুতা হয়ে গেল নিত্যপণ্য, খুবই প্রয়োজনীয়। জুতা তার আভিজাত্য হারাল।
কয়েক দশক আগেও পুরো একটা এলাকার খানদানি ছিল ‘অ্যান্টেনা’। অ্যান্টেনা প্রমাণ করত সব গ্রামকে বাদ দিয়ে ঐ গ্রাম টিভিওয়ালা। এরপর অ্যান্টেনা প্রতিটি গ্রামে এবং কিছু কিছু বাড়িতেও দেখা যেত। ঐ বাড়িগুলোর স্ট্যাটাস হতো অ্যান্টেনা। অ্যান্টেনার যুগ শেষ হতে না হতেই বাড়ি বা পরিবারের স্ট্যাটাস হয়ে গেল ডিশ অ্যান্টেনা।
ডিশ অ্যান্টেনার আগে অবশ্য খানদানি বা আভিজাত্য বোঝাত ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে। ঐ গাড়িটি হচ্ছে পরিবারের স্ট্যাটাস। ২০ বা ৩০-এর দশকে স্ট্যাটাস ছিল স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে পাবলিক পরীক্ষায় পাশ করা। অবশ্য যারা শিক্ষিত ছিল তাদের এই খানদানিকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখত সবাই। পেশাগত স্ট্যাটাসও কখনো কখনো সমাজে উঁকি দেয়। একসময় চিকিত্সক, প্রকৌশলী, ব্যারিস্টার, ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন পেশায় যে পরিবারের সন্তানরা ছিলেন তাদের মানুষ ভালো চোখেই দেখতেন। শ্রদ্ধা করতেন। কখনো কখনো শুধু পরিবার নয়, এমন পেশায় যারা ছিলেন তাদের কারণে আভিজাত্য বা খানদানি ভাব হতো পুরো গ্রামের বা এলাকার।
সময়ে সময়ে স্ট্যাটাস পরিবর্তন হয়। কখনো মোটরসাইকেল, কখনো পেজার, বড় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব, স্মার্ট ফোন—এসব নানা উপকরণ ব্যক্তিকে, পরিবারকে সমাজের কাছে ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত করতে দেখা যায় এই সমাজে। আর এসব কারণেই বন্দুকওয়ালাবাড়ি, মুচিবাড়ি, মাস্টারবাড়ি, মাঝিবাড়িসহ নানা নামে পরিচিত হয় পরিবার, বাড়ি বা ব্যক্তিগুলো। স্ট্যাটাসের শেষ নেই। যেমন—হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে স্ট্যাটাস ছিল লাঙল। খানদানি বাড়ির সেন্টার টেবিলে বা ড্রয়িং রুমে কাচের মধ্যে শোভা পেত পিতলের লাঙল। বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে রাখার কারণই হচ্ছে এই লাঙলটি ছিল ঐ বাড়ি বা পরিবারের খানদান বা স্ট্যাটাস। বিএনপির আমলে দেশে গাড়ির সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। গাড়ির ড্যাসবোর্ডে বা চালকের স্টিয়ারিংয়ের ওপরে শোভা পেত একগুচ্ছ ধানের শিষ। আর এখন শোভা নৌকা। সবাই না হলেও কেউ কেউ গাড়ির সামনে, বাড়ির সামনে, কোনো কোনো বাড়ির গেটের ডিজাইন, ড্রয়িংরুমে বা নিজের প্রিয় জায়গায় নৌকা রাখেন। যারা রাখেন তারা মনে করেন, এটা তাদের স্ট্যাটাস। এই মনে করাটা দোষের কিছু নয়। যার যেটা ভালো লাগে এবং তা যদি মঙ্গলজনক হয়, তাহলে সেটা করাই স্বাভাবিক। আর এসব কারণে বিভিন্ন আমলে নায়ক-নায়িকাদের মতো চুলের স্টাইল বা পোশাক পরিধান করাও অনেক আমলে স্ট্যাটাস হয়ে দাঁড়ায়। এই স্ট্যাটাস নিয়ে এত কিছু বলার কারণ হচ্ছে—মাঝেমধ্যেই আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের খানদান কী? আমাদের স্ট্যাটাস কী? ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন দেশ এগুলো আমাদের অহংকার, আমাদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। আমরা বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে বিজ্ঞানী পাঠাতে পারি, শ্রমজীবী মানুষ পাঠাতে পারি, নানা পণ্য পাঠিয়ে আমরা লাভবান হতে পারব; কিন্তু আমরা তো চেতনা বা অনুপ্রেরণা হূদয়ে ধারণ করতে পারি; কিন্তু কোনো দেশে তো তা রপ্তানি করতে পারব না। অতীত ইতিহাস ঐতিহ্যও কোনো পণ্যের মোড়কে পাঠাতে পারব না। তাহলে বিশ্বের কাছে বা দেশে আমাদের আভিজাত্য কী?
রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় রাস্তা দখল, ফুটপাত দখল। যাত্রীবাহী বাস, মালবাহী ট্রাক বা অন্য পরিবহনের নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতা। অথচ আমরা নিয়ম ভাঙি না, এটাই হতে পারত আমাদের স্ট্যাটাস। আমরা শৃঙ্খল এটাই হতে পারত আমাদের স্ট্যাটাস। বাজারে প্রতিটি পণ্যের যে দাম—এই দামকে অযৌক্তিক বলছে সবাই। ডিমের দাম এতটাই বেশি যে, তা প্রধানমন্ত্রীরও নজর এড়ায়নি।
এ তো গেল বাজার পরিস্থিতির কথা। প্রয়োজনীয় জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া বা ভুল সংশোধন, দলিল সংশোধন, জন্মনিবন্ধন করা বা সংশোধন, সার্টিফিকেটে কিছু সংশোধন, পাসপোর্ট করা বা সংশোধনসহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো যাদের করা দরকার—তারাই জানেন তাদের ভোগান্তি বা বিড়ম্বনা কতটা? অথচ এসব জরুরি কাগজপত্র বা সংশোধন যেটাই হোক—সব কাগজপত্র থাকলে মুহূর্তের মধ্যে বা কিছুটা সময় নিয়ে হলেও তা পাওয়া যায় বিড়ম্বনা ছাড়া—এটাই হতে পারত আমাদের আভিজাত্য বা স্ট্যাটাস।
সমাজের বা দেশের এমন ছোটখাটো অসংগতি হতে হতে বড় অনেক অসংগতি চোখে পড়ে। সচেতন মানুষের এগুলো কষ্ট দেয়। যে কোনো অসংগতি বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আমরা কখনো কখনো অনিয়মকারীকে প্রশ্ন ছুড়ে দিই ‘এটা কি মান্ধাতার আমল’ পেয়েছেন? মান্ধাতা এক পৌরাণিক চরিত্র। মান্ধাতার আমল হচ্ছে মান্ধাতার শাসনকাল অর্থাত্ অতি প্রাচীনকাল। পৌরাণিক কাহিনি থেকে জানা যায়, রাজা মান্ধাতা প্রায় ৩৫ লাখ বছর আগে রাজকার্য পরিচালনা করেছেন। অথচ এখনো অনিয়ম হলে, কোনো অন্যায় হলে মানুষ উপমা হিসেবে মান্ধাতার আমলকে তুলে ধরে। ‘মগের মুল্লুক’-এর উদাহরণও এখানে দেওয়া যায়। আরাকান বা মিয়ানমার হলো মগদের দেশ। ১৬২৫ সালে সমৃদ্ধিশালী বঙ্গভূমিতে লুটপাট শুরু করে পর্তুগিজ আর মগ জলদস্যুরা। তাদের অত্যাচারে ভয় ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তখন এই অঞ্চলের কেন্দ্র ছিল দিল্লি। মগরা ছিল মূলত জলদস্যু ও যোদ্ধা। এই জনপদের শাসক মোগলরা ছিল মগদের চেয়ে শান্ত। মগদের অত্যাচারে কোনোভাবে পেরে উঠতে পারছিল না আফগান থেকে আসা ঢাকার সুবেদার খান-ই-দুরান। মগদের সম্মিলিত অত্যাচারে রাজমহল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন দুরান। মোগল আমলের শেষ দিকে বাংলা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আসামের দিকে নজর দেয় মগরা। সেখানেও শুরু করে অত্যাচার আর অবিচার। মগদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সেই সময়ের শাসক আর সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে একাধিক যুদ্ধের মাধ্যমে মগদের পরাজিত করলে তাদের শক্তি কমে আসে। বলা হয়ে থাকে, এই ভূখণ্ডের মানুষ মগদের অত্যাচার সহ্য করেছে প্রায় ২০০ বছর। এখনো সবলের ওপর দুর্বলের অত্যাচার, অনিয়ম করা, মানুষকে কষ্ট দেওয়াসহ বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি, অরাজক পরিস্থিতি বা যথেচ্ছচার অবস্থা বোঝাতে মগদের আমলের সঙ্গে তুলনা করে প্রবাদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে ‘মগের মুল্লুক’।
আমরা বিশ্বাস করতেই চাই, চারদিকে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি বা বিড়ম্বনা, ঠকানোর প্রবণতা, অনিয়ম করা, ভিন্নপথে হেঁটে সবকিছু নিজের করে নেওয়াসহ এমন হাজারো অনিয়ম মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ‘মগের মুল্লুক’ বা ‘মান্ধাতার আমল’ আমাদের স্ট্যাটাস বা আভিজাত্য নয়। দেশ স্বাধীন হয়েছে বহু বছর আগে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী স্কুল মাঠে দাঁড়িয়ে ‘আমি শপথ করিতেছি যে, মানুষের সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখিব। দেশের প্রতি অনুগত থাকিব। দেশের একতা ও সংহতি বজার রাখিবার জন্য সচেষ্ট থাকিব। হে আল্লাহ, আমাকে শক্তি দিন। আমি যেন বাংলাদেশের সেবা করিতে পারি। এবং বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারি। আমিন।’ এমন শপথ বাক্য পাঠ করেছে। তারা বৃদ্ধ হয়েছে। তাদের সন্তানরা পড়েছে। এখন পড়ছে নতুন প্রজন্ম। আর সময় নষ্ট করার উপায় নেই। দেশ অবকাঠামোগতভাবে অনেক এগিয়েছে, আয় বেড়েছে। সঞ্চয় বেড়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন নম্রতা-ভদ্রতা আর কথায় নয়, সত্যিই কাজে বড় হওয়া। গ্রহণ করা উন্নত শিক্ষা। সেটাই হোক আমাদের স্ট্যাটাস বা আভিজাত্য।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল আই; সভাপতি, বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম