ঋণের ফাঁদে আটকা রায়পুরের বহু মানুষ

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এনজিওর ঋণে জর্জরিত উপজেলার বহু মানুষ। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে মানসিক চাপ থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষ। হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন অনেকেই। এই ঋণের ফাঁদে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরাও আটকা পড়েছে। প্রচলিত ব্যাংকের সুদ হার কম হলেও সেখান থেকে ঋণ পাওয়া সহজ নয়। ফলে অনেকেই উচ্চ সুদহারে অপ্রচলিত, ব্যক্তি খাত এবং এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ঐ ঋণের সুদ আর কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে এখন তারা দিশেহারা। নিঃস্ব হয়েছে বহু পরিবার। তবুও পরিশোধ হয়নি ঋণের কিস্তি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের পাঁচটি ইউনিয়ন মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর ভাঙন ও বন্যাকবলিত চরাঞ্চল। এই উপজেলায় ছোট-বড় এনজিওসহ নানা সমিতির নামে ঋণ ব্যবসা করছে শতাধিক সংস্থা। সম্প্রতি রায়পুরে নারী ও পুরুষসহ পাঁচ জন আত্মহত্যা করেছেন। ঋণ ও সুদের টাকা না দেওয়ায় হামলাসহ মারধর, লুটের ঘটনা ঘটেছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

গত সোমবার সানা উল্লাহ (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অর্থাভাবে সংসার চালাতে তিনি আশা, টিএমএস, পল্লী মঙ্গল ও রিক নামে চারটি এনজিও থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। অভাবের কারণে তিনি ঠিকমতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারতেন না। প্রায়ই এনজিওর মাঠকর্মীরা বাড়িতে এসে টাকার জন্য বসে থাকতেন। কোনো কোনো এনজিও কর্মী গভীর রাত পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করতেন এবং অপমানজনক কথা বলতেন। পরে কিস্তি ও সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে চাপের মুখে তিনি আত্মহত্যা করেন।

গত ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের হায়দার আলী ব্যাপারী মো. সিরাজ (৩৪) নামে এক যুবক আর্থিক সংকটে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে মানসিক চাপ সইতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মৃত সিরাজ একই এলাকার দিনমজুর মৃত সফিক উল্যার ছেলে।

গত ২৮ অক্টোবর রায়পুর পৌর শহরের পোস্ট অফিস সড়কের বয়াতিবাড়ির সুমি আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূ এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় আত্মহত্যা করেছেন। তিনি কয়েকটি এনজিও এবং স্থানীয় সমিতি থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বসতঘর নির্মাণসহ রিকশা ক্রয় করেন স্বামীর জন্য। কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অপমান সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এনজিওর চাপে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনার এ রকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে।

রায়পুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ বলেন, এনজিওগুলো যেন গরিবের রক্ত শোষণের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক এনজিও সঠিক নিয়মকানুন অনুসরণ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনও দেখা গেছে, কাগজে-কলমে ১০ শতাংশ সুদের কথা বলা হলেও এনজিওগুলো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। দরিদ্র মানুষ আরো দরিদ্র হচ্ছে। ঋণ গ্রহীতারা কোনো কারণে কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বাড়িতে এনজিও কর্মীরা দলবল নিয়ে ভয়ভীতি দেখানোসহ মামলায় জড়িয়ে পুলিশি হয়রানির ভয় দেখান। ইতিমধ্যে জেলও খেটেছেন অনেকে।