আধিপত্যের লড়াইয়ে নাটোর আওয়ামী লীগের ১২ নেতা খুন

হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে প্রকাশ্যে খুন করা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ওসমান গণিকে (৫০)। নিজের দলের লোকের হাতেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এই নেতা। তার মতো আওয়ামী লীগ-যুবলীগের অন্তত ১২ নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন গত ১৩ বছরে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। 

এসব খুনের পাশাপাশি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অনেক নেতা-কর্মী। ইত্তেফাকের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার সকালে নাটোরের লালপুরে সবশেষ কুপিয়ে এবং হাত-পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়েছে এক নেতাকে। এছাড়া সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুসের জানাজা থেকে ফেরার সময় ৩১ আগস্ট সংসদ সদস্য শিমুলের লোকের হাতে হামলার শিকার হন নলডাঙ্গা উপজেলা চেয়ারম্যান।

nator22

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য তখনকার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিক সরকারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ১৯৮০ সালে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে নাটোরে শুরু হয় হত্যার রাজনীতি।
 
রাজনৈতিক সূত্র বলছে, ২০০৯ সালের পর থেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই শুরু হয়। ২০১৪ সালে নাটোর সদর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন শফিকুল ইসলাম শিমুল। সে সময় প্রথম বারের মতো নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল কুদ্দুস। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক করা হয় সদর আসনের এমপি শফিকুল ইসলাম শিমুলকে। আরেক প্রভাবশালী নেতা শরিফুল ইসলাম রমজানকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রয়াত সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ান সদর আসনের সাংসদ শিমুল। কোন্দল চরম পর্যায়ে পৌঁছালে কুদ্দুসকে দীর্ঘদিন নাটোর শহরে দলীয় কার্যক্রম চালাতে দেননি শিমুল। সে সময় আওয়ামী লীগের এই দুই নবীণ-প্রবীণ নেতা একে অপেরর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেন।

দলের প্রবীণ নেতারা ইত্তেফাককে জানান, টানা ৮ বছর পর ২২ সালের সম্মেলনে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের পূনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন কুদ্দুস। তিনি এ বছরের ৩০ আগস্ট মারা গেছেন। ওই কমিটিতে শিমুলকে বাদ দিয়ে সাধারণ সম্পাদক করা হয় শরিফুল ইসলাম রমজানকে। ওই সম্মেলনের আগের রাতে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়। আধিপত্যের চরম লড়াই ছড়িয়ে পড়ে নাটোরের ছয়টি উপজেলাতেও।

অনুসন্ধান বলছে, এসব কোন্দলের জেরে আওয়ামী লীগের বিবাদমান দুইপক্ষের মধ্যে হামলা-মামলার রাজনীতি শুরু হয়। মাস তিনেক আগের হামলার প্রতিশোধ নিতে রোববার (২৩ জুলাই) দিবাগত রাতে কুপিয়ে যুবলীগের নেতা মিঠুনের ডান হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। 

দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৩ বছরে আওয়ামী লীগের ৫ নেতা-কর্মী খুন

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়াদের মধ্যে ২০১৪ সালের ১৮ জানুয়ারি নাটোরের সিংড়ার কলম ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বত্তরা। একই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর নাটোর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোজাম্মেল হক মজনুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন লালপুরের অর্জুনপুর বরমহাটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্বাস উদ্দিন। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বড়াইগ্রামের বাহিমালি গ্রামে খুন হন মাঁঝগাও ইউনিয়নের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু রায়হান। ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন সিংড়ার সুকাশ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন। এর আগে ২০১০ সালে নাটোর শহরের ভাটপাড়ায় আওয়ামী লীগের এককর্মীকে জবাই করে হত্যা করা হয়।

আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়াও ৭ বছরে যুবলীগের ৬ নেতা খুন

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ২০১৫ সালে ৫ মার্চ রাতে নাটোর শহরের ঝাউতলা এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় সিরাজ শিকদারকে। তিনি নাটোর পৌর সভার ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৬ সালের ৩ মে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাককে। তিনি সদর উপজেলার তেবাড়িয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি ছিলেন। ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ নাটোর শহরের কানাইখালী এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা ইমরানকে। তিনি নাটোর পৌর শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। একই বছরের ২৮ নভেম্বর জেলার লালপুরে খুন হন যুবলীগ নেতা জাহারুল ইসলাম। তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি লালপুর উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি লালপুরের গোপালপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি জামিরুল ইসলামকে নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি যুবলীগ নেতা হাসান আলীকে নাটোর শহরের বড়হরিশপুরের দত্তপাড়া বাজারে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হাসান আলী ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ছিলেন।

এসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম রমজান ইত্তেফাককে জানান, তার সঙ্গে কোনো নেতা-কর্মীর পক্ষপাতিত্ব নেই। মূলত জামায়াত-বিএনপির অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে কোন্দল তৈরি করে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছেন। এসব সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করতে জেলা আওয়ামী লীগ কাজ করছে। 

তবে নাটোর সদর আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল ইত্তেফাককে জানান, তিনিই নাটোর জেলা আওয়ামী লীগকে সংবদ্ধ রেখেছেন। অনেকেই দলের নাম ভাঙিয়ে নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা-মামলা করছেন। এসব রোধে জেলা আওয়ামী লীগ সব সময় প্রস্তুত আছে।

নাটোরের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, পুলিশ সব সময়ই বিশৃঙ্খলা এড়াতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। কোনো অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।