কৃষ্ণচরিত্র: সর্বগুণে উজ্জ্বল এক লোকোত্তর মহিমা

বহুদিন ধরে এ উপমহাদেশে কৃষ্ণকে অনৈতিহাসিক এক পৌরাণিক চরিত্র বলে প্রতিপন্ন করার সচেতন প্রয়াস ছিল। বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমীতে ছুটি ঘোষণা করে সরকার কৃষ্ণের জন্মের ঐতিহাসিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা কৃষ্ণপ্রেমীদের এক বড় অর্জন। এর জন্য এরশাদ সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।

আমরা জানি, দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিপরীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মথুরার রাজকন্যা দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মথুরা উত্তর ভারতের একটি প্রসিদ্ধ স্থান, আজও তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। কৃষ্ণ যেদিন জন্ম নিলেন, সেদিন ঘোর ঝড়জল—ভাদ্র মাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি। এই পবিত্র জন্মক্ষণকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কমপক্ষে সাড়ে ৩ হাজার বছর ধরে জন্মাষ্টমী হিসেবে উদ্যাপন করে আসছেন। তখন আধুনিক ক্ষণ গণনা কিংবা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তিত হয়নি; কিন্তু ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ভারতীয়দের এতটাই ব্যুত্পত্তি ছিল যে, তারা নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করে অভ্রান্ত ক্ষণ গণনা করতে পারতেন। যেমন ধরুন কৃষ্ণের জন্মক্ষণটির কথা। বলা হচ্ছে, ভাদ্র মাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি বছর ঘুরে এক বারই আসে। পলমাত্র এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই। সেই হিসাবমতো নানা ঐতিহাসিক মাপকাঠি পর্যালোচনা করে বলা যায়, কৃষ্ণের জন্ম খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি সত্তরোর্ধ্ব এক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।

পুরাণেতিহাসে যতটুকু সত্য পাওয়া যায়, তার আলোকে কৃষ্ণচরিত্র কেমন, সেটা পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি, শৈশবে কৃষ্ণ শারীরিক বলে অতিশয় বলবান। তার অমিত বলপ্রভাবে বৃন্দাবনে হিংস্র জীবজন্তু পরাভূত হতো—কংসের মল্ল প্রভৃতিও নিহত হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার রথ চালনার বিশেষ প্রশংসা দেখা যায়।

তিনি কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রভৃতি সে সময়ের প্রধান প্রধান যোদ্ধা এবং অন্যান্য বহুতর রাজার সঙ্গে কাশী, কলিঙ্গ, প্লৌক, গান্ধার প্রভৃতি রাজার সঙ্গে যুদ্ধে নিযুক্ত হয়ে তাদের সবাইকে পরাভূত করেন। তার যুদ্ধশিষ্যরা, যেমন—সাত্যকি ও অভিমন্যু যুদ্ধে প্রায় অপরাজেয় হয়ে উঠেছিলেন। স্বয়ং অর্জুনও কোনো কোনো বিষয়ে যুদ্ধ সম্বন্ধে তার শিষ্যত্ব স্বীকার করেছিলেন।

সেনাপতিত্বই যোদ্ধার প্রকৃত গুণ। কৃষ্ণের সেনাপতিত্বের বিশেষ গুণ প্রথম জরাসন্ধের সঙ্গে যুদ্ধে পরিলক্ষিত হয়। তার সেনাপতিত্বের গুণে ক্ষুদ্র যাদবসেনারা জরাসন্ধের সংখ্যাতীত সেনাকে মথুরা থেকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল। সেই অগণনীয় সেনার ক্ষয় যাদবদের পক্ষে অসাধ্য জেনে কৃষ্ণের মথুরা পরিত্যাগ করে নতুন নগরী নির্মাণের জন্য সাগরদ্বীপ দ্বারকার নির্বাচন এবং তার সামনে অবস্থিত রৈবতক পর্বতমালায় দুর্ভেদ্য দুর্গশ্রেণি নির্মাণে যে রণনীতিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমন পরিচয় পুরাণেতিহাসে আর কোনো ক্ষত্রিয়েরই পাওয়া যায় না।

কৃষ্ণের জ্ঞানার্জনী বৃত্তির চরম উত্কর্ষের পরিচয় শ্রীশ্রীগীতা। এখানে তিনি এক অতুল্য ধর্মকথার প্রবর্তন করেছেন। তবে এই ধর্মকথা যে শুধু গীতাতেই পাওয়া যায় এমন নয়, মহাভারতের অন্য স্থানেও পাওয়া গেছে। কৃষ্ণ কথিত ধর্মে যে জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়, তা প্রায় মনুষ্যাতীত। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অনন্ত জ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছেন।

সর্বজনীন ধর্মপ্রচারের পর রাজধর্ম বা রাজনীতিতেও তার অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত রাজনীতিজ্ঞ বলেই যুধিষ্ঠির ব্যাসদেবের পরামর্শ পেয়েও কৃষ্ণের পরামর্শ ব্যতীত রাজসূয় যজ্ঞে হাত দেননি। অবাধ্য যাদবেরা এবং বাধ্য পাণ্ডবেরা তাকে জিজ্ঞাসা না করে কোনো কাজ করতেন না। জরাসন্ধকে হত্যা করে কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্ত করা উন্নত রাজনীতির উত্কৃষ্ট উদাহরণ—সাম্রাজ্য স্থাপনের অল্প আয়াসসাধ্য অথচ পরম ধর্মসিদ্ধ উপায়। ধর্মরাজ্য সংস্থাপনের পর ধর্মরাজ্য শাসনের জন্য রাজধর্ম নিয়োগে ভীষ্মের দ্বারা রাজব্যবস্থা সংস্থাপন করানো, রাজনীতিজ্ঞতার দ্বিতীয় উত্কৃষ্ট উদাহরণ।

কৃষ্ণের বুদ্ধি লোকাতীত—তা সর্বব্যাপী, সর্বদর্শী, সব প্রকার উপায়ের উদ্ভাবনী। মনুষ্য শরীর ধারণ করে যতদূর সর্বজ্ঞ হওয়া যায়, কৃষ্ণ ততদূর সর্বজ্ঞ। অপূর্ব অধ্যাত্মতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব­—তা থেকে চিকিত্সাবিদ্যা, সংগীতবিদ্যা, এমনকি অশ্বপরিচর্যা পর্যন্ত তার আয়ত্ত ছিল। উত্তরার মৃত পুত্রের পুনর্জীবন এর প্রথম উদাহরণ; বিখ্যাত বংশীবিদ্যা দ্বিতীয় এবং জয়দ্রথবধের দিন অশ্বের শরীরে বেঁধা তির-উদ্ধার তৃতীয় উদাহরণ।

কৃষ্ণের কার্যকারিণী বৃত্তিসমূহের তুলনা চলে না। তার ধর্ম ও সত্য যে অবিচলিত, তার জীবনচরিতে তার অনেক প্রমাণ দেখেছি। সর্বজনে দয়া এবং প্রীতি তার জীবনালেখ্য পর্যালোচনায় পাই। বলবানদের চেয়ে বলবান হয়েও মানুষের কল্যাণে তিনি শান্তির জন্য দৃঢ়যত্ন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি সবার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, শুধু মানুষ নয়, ইতর প্রাণীর প্রতিও তার অসামান্য দয়া। গোবর্ধন গিরিযজ্ঞে তা পরস্ফুিট। তিনি আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর পরম হিতৈষী, কিন্তু আত্মীয় পাপাচারী হলে তিনি তার শত্রু। তার অপরিসীম ক্ষমাগুণ দেখেছি, আবার এও দেখেছি, কার্যকালে লৌহহূদয়ে অকুণ্ঠিতভাবে তিনি দণ্ড বিধান করেন। তিনি স্বজনপ্রিয়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে স্বজনের বিনাশেও তিনি কুণ্ঠিত নন। কংস মাতুল, পাণ্ডবেরা যা, শিশুপালও তা—উভয়েই পিসির পুত্র; উভয়কেই দণ্ডিত করলেন; তারপর, পরিশেষে স্বয়ং যাদবেরা সুরাপায়ী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠলে তিনি তাদেরও রক্ষা করলেন না।

এসব শ্রেষ্ঠ বৃত্তি কৃষ্ণচরিত্রে চরমভাবে বিকশিত হয়েছিল বলে, লোকচিত্তরঞ্জিনী বৃত্তির অনুশীলনে তিনি অমনোযোগী ছিলেন, এমন নয়। যে জন্য বাল্যে বৃন্দাবনে ব্রজলীলা, পরিণত বয়সে সেই উদ্দেশ্যে সমুদ্রবিহার, যমুনাবিহার, রৈবতক বিহার।

আমরা বলি, ভক্তিই মানুষের প্রধান বৃত্তি। কৃষ্ণ আদর্শ মানুষ, মনুষ্যত্বের আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি অবতীর্ণ—তার চরিত্রে ভক্তির প্রকাশ তেমন দেখলাম কই? যদি তিনি ঈশ্বরাবতার হন, তাহলে তার এই ভক্তির পাত্র কে? তিনি নিজে! নিজের প্রতি যে ভক্তি, সে কেবল নিজেকে পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্ন ভাবলেই আসে। এই ভাবনা জ্ঞানমার্গের চরম। একে আত্মরতি বলে। ছান্দোগ্য উপনিষদে যেমন বলা হয়েছে, ‘যে এ দেখে, এ ভেবে এ জেনে আত্মায় রত হয়, আত্মাতেই ক্রীড়াশীল হয়, আত্মাই যার মিথুন (সহচর), আত্মাই যার আনন্দ, সে স্বরাট।’ এই কথাই গীতায় কীর্তিত হয়েছে, কৃষ্ণ আত্মারাম; আত্মা জগন্ময়; তিনি সেই জগতে প্রীতিবিশিষ্ট।

আমরা দেখেছি, কৃষ্ণ সব জায়গায় সব সময় সব রকম গুণের অভিব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল। তিনি অপরাজেয়, অপরাজিত, বিশুদ্ধ, পুণ্যময়, প্রীতিময়, দয়াময়, অনুষ্ঠেয় কাজে সদা তত্পর—ধর্মাত্মা, বেদজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, ধর্মজ্ঞ, লোকহিতৈষী, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল, নিরপেক্ষ, শাস্তিদাতা, নির্মম, নিরহংকারী, যোগযুক্ত, তপস্বী। তিনি মানুষি শক্তি দিয়ে কার্যনির্বাহ করেন, কিন্তু তার চরিত্র মনুষ্যাতীত। যিনি বুঝবেন, কৃষ্ণচরিত্রে ঈশ্বরের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়, তিনি দুই হাত জোড় করে বিনীতভাবে আমার সঙ্গে বলুন—নাকারণাত্ কারণাদ্বা কারণাকারণান্ন চ।/ শরীরগ্রহণং বাপি ধর্মত্রাণায় তে পরম।

লেখক: ট্রাস্টি, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার