ট্রেন কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে টিটিপাড়া, সায়েদাবাদ দয়াগঞ্জের পথ দিয়ে চলছে, পথের দুপাশে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ট্রেনের যাত্রীদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। তাদের অনেকেই হাতের মোবাইল ফোনে টপাটপ তুলে নিচ্ছেন ফটো বা ভিডিও। এটি তো আর প্রতিদিনের সাধারণ কোনো ট্রেন নয়। এই ট্রেনটি আজ ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলায় যাচ্ছে। এটি এই পথে যাত্রীবাহী টেস্ট ট্রায়ালের প্রথম ট্রেন, যেটি গত বছর উদ্বোধন হয়ে যাওয়া পদ্মা সেতুর ট্রেন ট্র্যাক দিয়ে চলবে। দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে দ্রুততম সময়ে রেলপথে যোগাযোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে আজ। পথের দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ সে কথা জানে। তারা দীর্ঘদিন এই পথের নির্মাণযজ্ঞ দেখেছে, আজ সেই সুবর্ণ ক্ষণ, আজ ট্রেন চলাচল শুরু। পদ্মা পাড়ের মানুষ হিসেবে এই ট্রেনের যাত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি এই পথের মানুষের আনন্দে উদ্বেলিত শুভাশিস দেখে আরো বেশি পুলকিত বোধ হচ্ছে। দক্ষিণ বঙ্গের মানুষ রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের জন্য আজন্ম যেই বিড়ম্বনা, দুর্ভোগ সয়ে এসেছে, ঝড় বৃষ্টির দিনে প্রমত্তা পদ্মা পাড়ি দিতে আতঙ্কিত হয়েছে, অথবা শীতের কুয়াশায় ফেরিঘাটে কাটিয়েছে দুঃসহ সময়, সেই দিনগুলো অতীত হয়ে গেছে গত বছর পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই। তবে বাংলাদেশে ট্রেন যাত্রা সুলভ, স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ হওয়ার কারণে সবার কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য। আমরা দক্ষিণ বঙ্গের মানুষ সেই স্বস্তি, সাশ্রয়, নিরাপত্তার আশায় মুখিয়ে আছি বহুদিন। কু ঝিক ঝিক শব্দে না হোক, ঝম ঝম শব্দে প্রচণ্ড গর্জনে আনন্দের হুংকার দিতে দিতে আমরা একদিন রাজধানীতে পৌঁছে যাব, এই প্রত্যাশা দক্ষিণের প্রতিটি মানুষের ছিল। এই ক্ষেত্রে ফরিদপুর জেলার মানুষের আবেগ আরো প্রবল। ফরিদপুরের সন্তান হিসেবে এই টেস্ট ট্রায়াল ট্রেনে চড়ে নিজ ভূমিতে যাত্রার অনুভূতি কি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব? আজ দক্ষিণ বঙ্গ ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে! আমাদের পূর্বপুরুষেরা নৌপথে ঢাকায় যাতায়াত করতেন। আজ ট্রেন সেই নদী বক্ষ ভেদ করে আমাদের নিমেষেই পৌঁছে দেবে মাতৃভূমিতে।
ফরিদপুরে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল ১৮৯৯ সালে। সেই যোগাযোগ স্থাপনে তত্কালীন ফরিদপুরের কৃতী সন্তান কংগ্রেসের সভাপতি বাবু অম্বিকা চরণ মজুমদারকে প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছিল। তার অবদানে রেল ফরিদপুরের বর্তমান অম্বিকাপুর পর্যন্ত এলো, এই পথ রাজবাড়ী হয়ে কলকাতা পর্যন্ত গিয়েছে দেশ ভাগের আগে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে ফরিদপুর থেকে ছেড়ে আসা কোনো ট্রেন ছুঁঁয়ে দেখতে পারেনি। এরই মধ্যে ফরিদপুরের রেল যোগাযোগ লোকসানের দোহাই দিয়ে ১৯৯৭ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফরিদপুরের আপামর জনগণের দাবির মুখে পুনরায় ২০১৪ সালে ফরিদপুর-রাজবাড়ী রেল যোগাযোগ শুরু হয়। ফরিদপুরের মানুষ আবার ফিরে পায় তার সুলভ নিরাপদে ভ্রমণের সুযোগ ও অধিকার। কিন্তু সেই পথ নাতিদীর্ঘ ছিল। আজ দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার দিন শেষ হতে যাচ্ছে। আজ থেকে ফরিদপুরের একটি অংশের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ স্থাপিত হতে যাচ্ছে। এটি দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের মাইলফলক। আজ থেকে উত্তর-দক্ষিণের সেতুবন্ধ হতে যাচ্ছে। আজ থেকে সমগ্র বাংলাদেশ একটি রেল নেটওয়ার্কের আওতায়। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ হতে পদ্মা ব্রিজের ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় নবনির্মিত জংশন পর্যন্ত টেস্ট ট্রায়াল ট্রেন চলাচল শুরুর কথাই বলছি।
এই রেলপথ কতটা কাঙ্ক্ষিত, তা সব পথের দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখলে বোঝা যায়। তাদের বাতাসে দোলায়িত হাতের ছন্দে অনুভব করা যায়। দক্ষিণ বঙ্গ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। এখন থেকে কৃষি, শিক্ষা, শিল্পায়নের অগ্রগতির নতুন পথে হাঁটবে দক্ষিণের অনগ্রসর জেলাগুলো। এই যে রেল দক্ষিণের পানে চলছে, এটা অকল্পনীয় ছিল। শুধু প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হার না মানা দৃঢ় সংকল্পে আর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফল আজকের পদ্মা ব্রিজ আর এই রেলপথ। আজকের এই শুভদিনে তাই শ্রদ্ধাভরা কৃতজ্ঞতা জননেত্রীর প্রতি। দক্ষিণের জনগণ চিরদিন আপনার এই অবদান কৃতজ্ঞতাপাশে মনে রাখবে।
লেখক: কবি ও পরিব্রাজক