এখনও শোনা যায় হাছন রাজার জাদুকরী সুর

শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সিলেটের বিশ্বনাথের রামপাশায় দাঁড়িয়ে আছে হাছন রাজার ঐতিহাসিক পৈতৃক নিবাস। সবুজ অরণ্যে ঘেরা নিবাসের সম্মুখে রয়েছে বড় একটা দীঘি। এর চারপাশে আছে আরও কয়েকটি টিনশেডের বাড়ি। ইট-পাথরের কালজয়ী হাছন রাজার দুইতলা পৈতৃক নিবাস আর খাজনা আদায়ের বৈঠকখানা, দেখে যেন মনে হয় এখনও মরমী কবি হাছন রাজা তার জাদুকরী সুর এখনও শোনা যায়।

হাছন রাজা তার সৃষ্টি ও জীবনদর্শনে বাংলার লোক সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। সিলেটের ভোগবিলাসী এই জমিদার একসময় মরমী সাধকে রূপান্তরিত হন। তার রচিত অসংখ্য গান বিশ্বব্যাপী আলো ছড়ালেও সিলেটে গড়ে ওঠেনি সেগুলো চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো। অযত্নে, অবহেলায় তার স্মৃতিচিহ্নগুলোও ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বিশ্বনাথের রামপাশায় রাস্তার পাশেই সবুজ মাঠের মধ্যখানে হাছন রাজার ঐতিহাসিক দ্বিতল পৈতৃক ভবন। ভবনের সম্মুখে রয়েছে বড় একটি দিঘী। যেখানে এক সময় রাজারা ব্যবহার করতো দীঘিটি। ১৩৫২ সালে নির্মিত জমিদারদের ঐতিহাসিক ভবনটি সংস্কার আর রক্ষণা-বেক্ষণের অভাবে ফাটল ধরে ধ্বসে পড়ার অবস্থায় রয়েছে। প্রাচীন প্রাচীরগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও এখনো তার উপরিভাগে চোখ ধাঁধাঁনো নকশার কারুকাজ ফুটে আছে। দ্বিতল প্রাচীরটিও শ্যাওলা ধরে স্যাঁতসেঁতে হয়ে প্রকার ভেদের সবুজ গাছ বেড়ে উঠেছে। কিছু দেয়াল আর জানালা ভেঙে গেছে।

372850162_262049080067663_4195423581454566991_n

উপরের দ্বিতীয়তলায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখা যায়, সেখানে আছে প্রায় ২৪টি বড় বড় খুঁটি। তার মধ্যে কারুকাজ করা খুঁটি আছে নয়টি। আছে তিনটি দরজা আর ছয়টি জানালা। এর সংলগ্ন স্টোর রুমের পাশে আছে দুইটি জানালা ও  দুটি দরজা। সেগুলোও ধ্বসে পড়ার অবস্থায়। দ্বিতীয় তলার অর্ধ দেয়ালের পুরো বারান্দা জুড়ে নকশার কারুকাজ। ভবনে বৃষ্টির ময়লা পানি জমে শ্যাওলার জট ধরেছে। পাকা ছাদও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে একেবারে নষ্ট হয়ে প্রাচীর বেয়ে পানি পড়ছে। তেমনই দ্বিতল ভবনের পাশের খাজনা আদায়ের বৈঠকখানারও একই দশা।

373044412_1583254175827087_2595762546195383465_n

শত বছরের পুরাতন রাজাদের বাসভবনটি এক নজর দেখতে দেশ-দেশান্তর থেকে ছুটে আসে অসংখ্য দর্শনার্থীরা। ভবনটি জুড়ে স্মৃতির ডানা মেলেছে মরমী কবি হাছন রাজা ও তার পূর্ব পুরুষের। অথচ এই খ্যাতি আর ঐতিহাসিক স্মৃতিময় রাজকীয় প্রাসাদটি এখনো সংস্কার করেননি কেউ। তাছাড়া নেই কোনো সরকারি ও বেসরকারি কোনো উদ্যোগ। এ কারণে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে ঐতিহাসিক এই প্রাসাদটি।

373058962_1801310493634081_6232884224278937492_n

১৮৫৪ সালে মরমী কবি হাছন রাজা সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা নদীর তীরে লক্ষণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১) জন্মগ্রহণ করেন। হাছন রাজার পিতা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী ছিলেন সেই সময়ের প্রতাপশালী জমিদার রাজা। হাছন রাজা ছিলেন তাঁর তৃতীয় পুত্র। মরমী কবি হাছন রাজার পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন হিন্দু। সেই সময় তাদের বংশের বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহদেব মতান্তরে বাবু রায় চৌধুরী নামের একজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তখন কবির পূর্বপুরুষেরা অযোধ্যায় বসবাস করতেন। পূর্বপুরুষেরা সিলেটের আসার আগে দক্ষিণ বঙ্গের যশোর জেলার কাগদি নামক গ্রামে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীর অন্তিম সময়ে হাছন রাজার পূর্বপুরুষ বিজয় সিংহ সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার কোণাউরা গ্রামে বসবাস করেন। তখন তিনি হঠাৎ গ্রাম ত্যাগ করে একই এলাকায় নতুন আরেকটি গ্রামের গোড়াপত্তন করেন। তখন  বিজয় সিংহ তার বংশের আদি পুরুষ রামচন্দ্র সিংহ দেবের নামে প্রথমাংশ ‘রাম’ যোগ করে এলাকারটি নামকরণ করেন রামপাশা।

373289130_618744910441940_4080164691584902466_n

সেই সূত্র ধরেই হাছন রাজার বাবা দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী দুই এলাকার জমিদার ছিলেন। একটি রামপাশা আরেকটি লক্ষণশ্রীর। পিতার জমিদারী ছেড়ে দেওয়ার পর রামপাশার দায়িত্ব পালন করেন হাছন রাজার জ্যেষ্ঠ ভাই। আর লক্ষণশ্রীর দায়িত্ব পালন করতেন হাছন রাজা।  কিন্তু বড় ভাই বেশি দিন রাজত্ব করতে পারিনি। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে দেহ ত্যাগ করেন তিনি। এই অবস্থায় দুই এলাকার জমিদারী দায়িত্ব হাছন রাজার কাঁধে পড়ে। বাবার উত্তরাধিকার সূত্রে হাছন রাজা ছিলেন বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক। বিশ্বনাথের রামপাশা এলাকা ছিলো তারই একটি অংশবিশেষ।

373419469_709417907695091_5308736899935382799_n

খ্যাতনামা কবি হাছন রাজা ভালোবাসতেন ভোগ বিলাসী ও সৌখিন জীবন। তিনি ভালোবেসে অসংখ্য গান রচনা করেছিলেন। নিজের লেখা রচনাকৃত গান সেই সময় রামপাশায় বাদ্যযন্ত্র বেজে গান গেয়ে নৃত্য পরিবেশন করতেন ও করাতেন। শুধু গান ও নৃত্য নয়। ভালোবাসতেন পাখি, ঘোড়া ও হাতি আর আনন্দ বিহারে সময় কাটানো। অবশ্য এই দাম্ভিক জীবনযাপন আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দর্শনের জন্য খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ইতি টানে। বিলাসী জীবনযাপন, আরাম-আয়েশ ও শৌখিন জীবনযাপন ছেড়ে, মনের দুয়ার খুলে ধীরে ধীরে সৌম্যভাব পথে চলে আসেন। এক সময় নিজের জমকালো পোশাক পরিধানও ছেড়ে দেয়।

১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ২ মাত্রায় ভূমিকম্পে তার একটি পোষা হাতির মৃত্যু হয়। সেই থেকে কবি আরও বেশি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে হাছন রাজা হয়ে উঠেন মরমী কবি রূপে। তার রচিত মাহাত্ম্যপূর্ণ সহস্রাধিক গান রয়েছে বাংলার ইতিহাসে। গুণী মরমী কবি হাছন রাজা পৃথিবী থেকে দেহ ত্যাগ করেন ১৯২২ সালে ৭ ডিসেম্বর।

স্থানীয় বাসিন্দা তেরাব আলী বলেন, দূর-দূরান্তর থেকে অনেক মানুষ দেখতে আসে রাজাদের ভবনটি। এমনকি মাঝেমধ্যে আসে হাছন রাজার স্বজনরা। অথচ তারা শুধু দেখে যায়, কোনো সংস্কার করে না।

373457939_613302377545896_6912689556372782504_n

অপর আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ রাশেদা বেগমও বলেন, ভবনটি মেরামত করলে আরও সুন্দর ও আকর্ষনীয় হয়ে উঠতে পারতো। অনেক মানুষ এখানে এসে গান করে, ছবি তুলে। কিন্তু  প্রাসাদটির কেউ মেরামত করেনা। 

বিশ্বনাথ উপজেলার চেয়ারম্যান এস এম নুনু মিয়া বলেন, হাছন রাজার পৈতৃক বাড়িটি অনেক পুরাতন আর রাজাদের বহু স্মৃতি রয়েছে। আমি চেয়েছি এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে কিছু একটা করার। এজন্য হাছন রাজার স্বজনদেরকে জানিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো সাড়া দেয়নি। তারা নাকি জাদুঘর করবে এমনটি শুনেছিলাম। অথচ বাস্তবে আজও উদ্যোগের কোনো কার্যক্রম দেখিনি।

বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান এবিষয়ে প্রতিবেদককে বলেন, সরকারি পক্ষ থেকে আমরা ইতিহাস বিজড়িত ভবনের কাজ করতে পারি। সংস্কারও করতে পারি। কিন্তু এটা ব্যক্তি মালিকানা। হাছন রাজার স্বজনরা যতদিন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ না নেন সেই সাপেক্ষে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।