সম্মেলনে বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার প্রশ্ন

এই শীর্ষ সম্মিলন একটি কঠিন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা জানি, ইউক্রেন যুদ্ধ বর্তমান সময়ে বিশ্বকে কাবু করে ফেলেছে। একদিকে যেমন বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক সংকটে উপনীত, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় এই যুদ্ধ বিশ্বে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক যে কেবল শত্রুভাবাপন্ন তা-ই নয়, একে যুদ্ধের উপক্রম পর্যায়ের বলা যায়

৯-১০ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গ্রুপ অব টোয়েন্টির (জি-২০) অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনকে ঘিরে ব্যাপক বিশ্লেষণ হয়েছে, দেখা গেছে উত্সাহ-উদ্দীপনা। ভারত এই সম্মেলনের হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আমরা দেখতে পেয়েছি, ভারত এই জি-২০-এর সভাপতি হিসেবে বা চেয়ার হিসেবে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করে। সারা বছর বিভিন্ন ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করে এবং শেষ পর্যন্ত এই শীর্ষ বৈঠক সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ করা দরকার, এই শীর্ষ বৈঠক জি-২০-এর ১৯টি  অর্থনীতি ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অংশগ্রহণে সারা বিশ্বে একটি শক্তিশালী মঞ্চ বা প্ল্যাটফরম হিসেবে আবির্ভূত হয়।

১৯৯৯ সাল থেকে যাত্রা শুরু হলেও ২০০৮ সালে একটি শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে জি-২০ বিশ্বে একটি অনন্য গ্রুপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘অনন্য’ এ কারণে যে, এটি একমাত্র গ্রুপ, যেখানে জি-৭ভুক্ত সাতটি দেশ ও ব্রিকসের পাঁচটি দেশ তথা মোট ১২টি দেশ যুক্ত রয়েছে। তার বাইরেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, আরো সাতটি দেশ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যুক্ত রয়েছে এখানে। অর্থাত্, বিশ্বের লিডিং ও বিভিন্ন দিক থেকে শক্তিশালী দেশগুলো যুক্ত রয়েছে জি-২০-এর সঙ্গে। ফলে স্বভাবতই জি-২০-এর যে কোনো শীর্ষ বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে সব সময়ই।

লক্ষ করা গেছে, ভারত জি-২০ এবারের শীর্ষ সম্মেলনকে একটি ‘মহাসম্মেলন’ হিসেবে আয়োজন করার চেষ্টা করে। এবং সেই চিন্তা থেকে অনেক বড় পরিকল্পনাও গ্রহণ করেন প্রধানমনন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যেমন—সম্মেলনের বেশ আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, প্রায় ১ লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা অংশ নেবেন। বস্তুত, এই সম্মেলনে ভারত বিভিন্ন দিক থেকে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে একটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করতে চেষ্টার কমতি রাখেনি।

এবারের সম্মেলনে লক্ষাধিক অংশগ্রহণকারীর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিষয়ে প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে অ্যাক্টিভিটির বিষয় জি-২০-এর সম্মেলনে এসে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিগণ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ভারতের এই সম্মেলনে দুই শতাধিক মিটিংয়ের আয়োজন হয়। এবং এই সভাগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে পরিবেশ রক্ষার মতো যেসব বিষয় আছে, তা প্রাধান্য পায়। পাশাপাশি জি-২০-এর মধ্যে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত আছে—অর্থনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতি—সেগুলো গুরুত্ব পায়। এবং আরো বলা হচ্ছে যে, এই সামিটের মাধ্যমে ৬৮টির বেশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দলিল গৃহীত হয়েছে। এবং সেখানে যৌথ ঘোষণা ছিল, বিভিন্ন প্রতিবেদন ছিল। এসব বিবেচনায় বলা যায়, দিল্লিতে জি-২০-এর আলোচনা, বক্তব্য বা সংলাপের রেকর্ড টিকে থাকবে লম্বা সময় ধরে।

ভারত এবার যে বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তা হলো বহুপক্ষিকতাকে একটি নতুন মোড়কে বন্দি করা। এই কাজটা করার জন্য অনেক কিছুই করতে হয়েছে মোদিকে। সে ক্ষেত্রে আমরা যেটা দেখেছি তা হচ্ছে, এই জি-২০ সম্মেলন বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এবং একে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ সম্ভব। এই শীর্ষ সম্মেলন বা মহাবৈঠক সামনে নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা তুলে আনতে পারি। প্রথমত, হোস্ট রাষ্ট্র হিসেবে ভারত জি-২০ নিয়ে তার নিজের ভাবনাকে দৃশ্যমান করেছে। গত দেড় দশক ধরে ভারতে অর্থনৈতিক ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, ভারতের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হয়েছে এবং সার্বিক দিক থেকে ভারত একটি ভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করছে। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের অর্জনগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ভারতের অবকাঠামগত যে উন্নতি হয়েছে; একই সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক, সামাজিক যে উন্নায়ন হয়েছে, সেগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরার দারুণ সুযোগটি হাতছাড়া করেননি মোদি। একই সঙ্গে ভারতের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনার প্রতিফলন আমরা জি-২০ বৈঠকে দেখতে পেয়েছি।

ভারত এই শীর্ষ বৈঠকের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে বলেছে যে, সমগ্র পৃথিবী একটি পরিবারের মতো। ওয়ান ওয়ার্ল্ড, ওয়ান ফ্যামিলি ও ওয়ান ফিউচার তথা সমগ্র বিশ্বের মধ্যে অবিভাজ্যের যে বিষয়, সেটি গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাত্, বিশ্বমানবতাকে একটি একক সত্তা হিসেবে কাজ করতে হবে—এ ধরনের একটি বক্তব্য স্থাপন করেছে। এরপরে যে বিষয়টি আমরা লক্ষ করেছি সেটি হলো, ভারত ৯টি বন্ধু রাষ্ট্রকে জি-২০ বৈঠকের আয়োজক রাষ্ট্র হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়, যেখানে বাংলাদেশও আছে। বাংলাদেশের বাইরে আমরা সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোকে লক্ষ করেছি। এই দেশগুলো জি-২০ বৈঠকে যুক্ত হওয়ায় ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হবে। জি-২০-এর সঙ্গে আরো ৯টি দেশ যুক্ত হওয়ায় ভারতের যে কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতি, তা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে যুক্ত করার মাধ্যমে প্রশংসিত হবে। তাছাড়া আয়োজনকারী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত মুখ্য যে বিষয় ঘোষণা করে তা হলো, ভারত বলেছে, তারা ছয়টি বিষয়ের ওপরে বিশেষ গুরুত্ব দেবে। এক. সবুজ উন্নয়ন, জলবায়ুসংক্রান্ত অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার কথা বলা হয়েছে। এতে করে পরিবেশকে সবার ঊর্ধ্বে  স্থান দেওয়া হয়েছে। দুই. ভারতের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে আরো বেগবান করা এবং আরো বেশি টেকসই করা। তিন. টেকসই উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটিকে আরো উন্নত করা, ত্বরান্বিত করা, গতিশীল করা। এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ভারত। চার. প্রযুক্তিগত যে রূপান্তর ভারতে ঘটছে, বিশেষ করে পাবলিক ইনফ্যাক্টোটাইসকে আরো বিশেষভাবে ডিজিটালাইজড করা, আরো বেশি তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ভারতের জন্য। পাঁচ. বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় ক্ষেত্রগুলোকে আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে মনোযোগী হওয়া। এবং একটি বহু মেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া, যাতে করে একবিংশ শতাব্দীর সমস্ত চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করা যায়। ছয়. নারীর নেতৃত্বে যে উন্নয়ন, সেই উন্নয়নকে বিবেচনায় নেওয়া। এরকম ছয়টি বিষয়কে ভারত অগ্রাধিকার দিয়েছে। এবং এই বিষয়গুলোর আলোকেই জি-২০-এর এবারের মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবং এর ফলে আয়োজনকারী দেশ হিসেবে ভারতের নিজস্ব চিন্তার যেমন প্রকাশ ঘটেছে এবং সেই চিন্তা নিঃসন্দেহে অন্যান্য দেশের চিন্তার সঙ্গেও মিলে গেছে!

মনে রাখতে হবে, এই শীর্ষ সম্মিলন একটি কঠিন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা জানি, ইউক্রেন যুদ্ধ বর্তমান সময়ে বিশ্বকে কাবু করে ফেলেছে। একদিকে যেমন বিশ্ব অর্থনীতি একের পর এক সংকটে উপনীত, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় এই যুদ্ধ বিশ্বে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক যে কেবল শত্রুভাবাপূর্ণ তা-ই নয়, একে যুদ্ধের উপক্রম পর্যায়ের বলা যায়। ফলে এরকম একটি বাস্তবতাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে রাশিয়াকে। পাশাপাশি এর একটি বড় ধরনের রাজনীতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। এবং এসবের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই কিন্তু অনুষ্ঠিত হয় এবারের শীর্ষ সম্মেলন। ফলে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এই শীর্ষ সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম।

দিল্লি জি-২০ বৈঠকে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ নিয়েছেন। এবং তিনি যে বক্তব্য রেখেছেন, সেখানে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এক দশকের অর্জনগুলোর কথা তুলে ধরেছেন বিশ্বের সামনে। এবং আমরা জানি যে জি-২০-এর এই সামিটে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে নতুন মাত্রায়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক জি-২০-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি আমি।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের অগ্রাধিকারের যে বিষয়গুলো জি-২০ লক্ষ্যমাত্রায় আছে বা ভারত যেগুলো নির্ধারণ করেছে, তা সারা বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। এবং জি-২০ভুক্ত দেশগুলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এটিকে প্রাধান্য দেবে। ফলে এই জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশ একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে বলতে হবে। স্বাভাবিক বিচারে জি-২০ এবারের সামিটের আয়োজনকারী দেশ হিসেবে ভারত তাদের ব্যাপক শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছে। ভারত বহুপাক্ষিকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে ভারতের আলোকিত মনোভাবের একটি পরিচয় আমরা পেয়েছি। সব মিলিয়ে জি-২০-এর এবারের সামিট নতুন দিগন্তের সূচনা করছে, নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এবং বিশ্বের ধনী-দরিদ্র রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি আরো শক্তিশালী হয়েছে নিঃসন্দেহে। বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে এটি অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। 

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)