এ দেশে বা ব্রিটেনে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়—‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু গেট ইনভলভড’। মানে, আমি তোমার ব্যাপারে বা অন্য কারো বিষয়ে নাক গলাতে চাই না। এটা শুধু মুখের কথা নয়, মনে-প্রাণে এরা বিশ্বাস করে। যখন জেসমিন বেকফোর্ডকে পিটিয়ে ওর বাবা মেরে ফেলেছিল, যখন একজন পেনশনার রেডিয়েটর জড়িয়ে মরে, বাড়িতে একা গলিত দেহে ছিল, যখন স্ত্রীকে অত্যাচার করে তাকে পাগল বানানো হয়েছিল, তখনো ঐ একই কথা—এটা তো ওদের বিষয়। আমি এর ভেতরে জড়াতে চাই না। এটা হলো ব্রিটেনের সভ্যতার একটি দিক। জেসমিন মারা যাওয়ার পর এ নিয়ে নানা সমালোচনা উঠেছিল কাগজে এবং সবাই বলেছিল, চারপাশের প্রতিবেশীরা কেন কিছু করেনি? একই কথা—‘এটা জেসমিন বেকফোর্ডের বাবা-মায়ের বিষয়। আমরা এর ভেতরে যেতে চাই না।’ আসলে এরকম ঘটনাকেই ব্রিটেনে সভ্যতা বলে মনে করা হয়। কেউ রাস্তায় মরে বা নানা কারণে পড়ে আছে, সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যায়। জানে এর ভেতরে জড়ালে তার কিছু সময় খরচ হবে। কাজেই একে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই ভালো। আমি দু-এক সময় রাস্তায় পড়ে গেছি। কখনো কাউকে এগিয়ে আসতে দেখিনি। একবার অনেকক্ষণ রাস্তায় পড়ে ছিলাম। সবাই দূর দিয়ে চলে গেছে। চিত্কার করে ডাকলেও কেউ কাছে আসেনি। অবশ্য এর ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। আমার প্রতিবেশী ডরোথি দুই মেয়ে নিয়ে ভালোই ছিল। সে বেশ ভালো একটা কাজ করত। হঠাত্ একদিন দেখি ডরোথির বাড়িতে একজন নতুন লোক। ধরা যাক তার নাম রিচার্ড। লোকটি বেড়াতে আসেনি। সে এসেছে ডরোথির স্বামী পলকে তাড়িয়ে দিয়ে তার জায়গা দখল করতে। আমি তো অবাক। একদিন দেখি পল তার জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল। আমি বললাম, তুমি চলে যাবে? একটু করুণ হেসে বলে, এটা তো ডরোথির নিজের জীবন। ও রিচার্ডকে পছন্দ করেছে। কাজেই আমি চলে যাই, যেখানে আমার বাড়ি। এ ঘটনায় পাড়া-প্রতিবেশী কেউ কিছু বলে না। এবং ডরোথিও স্বাভাবিক জীবন যাপন করে চলেছে। ও খুবই চমত্কার একজন মানুষ। তাই বলে ওর পছন্দ-অপছন্দ থাকবে না, ভালো হওয়ার জন্য সব বিসর্জন দেবে, সেটা ওরা মানে না। ধরা যাক, এমন ঘটনা আমাদের দেশে হলো! ভেবে নেওয়া যেতে পারে, এরপর ডরোথিকে কে কীভাবে দেখবে? এখন মেয়ে দুটি বড় হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। তাদের পুরুষের হাত ধরে। বিয়ে করেনি। লিভ টুগেদার করবে। ডরোথি আর রিচার্ড ফুরফুরে পাখির মতো মাসে দু-তিন-চারটি হলিডে করে জীবন কাটায়। মনে হয় ডরোথি খুব সুখে আছে। শুনেছি পলের খুব অসুখ হয়েছিল। এখনো বেঁচে আছে কি না, জানি না। এখানে বিচার করা হয়—প্রতিবেশী হিসেবে ও কেমন, নাগরিক হিসেবে কেমন, ঠিকমতো ট্যাক্স দেয় কি না, সুন্দর করে সবার সঙ্গে কথা বলে কি না, প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখে কি না—এই সব। আমার প্রতিবেশী হিসেবে ওকে মোটেই ‘ভালো নয়’ এমন মার্কা দেওয়া যাবে না। আমার ‘কলেকটেড শর্ট স্টোরি’ ওর খুব ভালো লেগেছে। এ ছাড়া আরো নানা খোঁজ-খবর। আমাদের রাস্তায় আর যারা আছেন, তাদের কেউ বিয়ে করেছেন কি না, কেউ লিভ টুগেদার করছেন কি না—এ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কারোরই নেই। তবে এর মধ্যে কেউ যদি ‘রুড’ ভাষায় কথা বলে, ভালো আচরণ না করে, বিনয় না দেখায়, সেটাই বিশেষভাবে আলোচিত হয়। কেউ যদি শব্দদূষণ করে, সেটা নানাভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। কখনো পুিলশকেও খবর দেওয়া হয়। আমাদের দেশে শব্দদূষণের কোনো আইন নেই। কারো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কেন মেরি পলকে ছেড়ে রিচার্ডকে নিয়ে থাকে, কেন ২২ নম্বর বাড়ির ছেলেমেয়েরা রাস্তায় দুষ্টুমি করে, কথার সুন্দর বা পোলাইট উত্তর দেয় না—এ সবই আলোচনার বিষয়। ভাবুন তো হুমায়ুন আহমেদের বিয়ে নিয়ে এখনো কত কথা হয়! এ যে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, সে নিয়ে কেউ কি চুপ করে থাকতে পারে? মেয়ের বয়সি? মেয়ের বয়সি যদি তার একাকিত্বে তাকে ভালোবাসে, সেটা কি কারো দোষ? তিনি কি তার জীবনে একটি মেয়ে পেতেন না? এখানে ভালোবাসার কথা আলোচনা হয় না। বেশির ভাগ আলোচনা করেন তারা, যারা নিজেরা বিয়ে করেছেন দুই-তিন বার। ভাবখানা এই—আমরা বিয়ে করেছি, তবে ছেলের বয়সি বা মেয়ের বয়সি নয়। এদের সঙ্গে তর্ক করতে আমার রুচিতে বাধে।
রিচার্ড ও ডরোথি আমার পাশের বাড়িতে থাকেন। মাঝখানে একটা দেওয়াল। এরা প্রায়ই হলিডেতে যান। মাসে তিন-চার বার। মনে হয় বাড়ি ওদের ভালো লাগে না। আমার খুব অবাক লাগে। আমার তো মনে হয় নিজের বাড়ি, নিজের ঘরের চাইতে সুন্দর আর কী আছে!
আমাদের কাউন্সিল থেকে তিনটা বিন দেয়। একটা নীল, সেখানে কাগজ, কাচ, বোয়াম, টিন এসব ফেলা হয়। সবুজটায় ফেলা হয় বাগানের গাছ-পাতা। আর কালোটায় এসব বাদে আর যা থাকে। রিচার্ডরা বিনগুলো যখন খালি করার দিন বাইরে দিয়ে চলে যায়, তারপর ওগুলো পড়ে থাকে। কখনো ঢাকনা খোলা। কখনো এখানে-সেখানে। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় বা পেভমেন্টে। হয়তো কাউকে বলে যায়, তবে সে এসে সুন্দর করে বিনগুলো দেওয়ালের ওপারে গুছিয়ে রাখে না। আমি আগেই বলেছি, কেউ কারো কাজে হাত দেয় না, যদি না তাদের বলে যাওয়া হয়। কাজেই বিনগুলো পেভমেন্টে পড়ে থাকে। বাংলাদেশের সালেহা চৌধুরী ঐ সব বলে গেল কি গেল না, সে নিয়ে মাথা ঘামায় না। কাজেই তিনটি বিন সুন্দর করে দেওয়ালের ওপারে, ওদের বাড়ির সামনে সাজিয়ে রাখে। এবং যে দুই সূর্যমুখী বাড়ির সামনে শুকিয়ে মরে যেতে শুরু করেছে, সেগুলোও পানি দিয়ে সতেজ রাখে। এটা করে, কারণ তার এসব বিশৃঙ্খলা ভালো লাগে না। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয়। এইভাবেই চলছিল। একদিন পথের মধ্যে রিচার্ডের সঙ্গে দেখা। ও বলে, আমি অনেক বার হলিডেতে যাই। এবং আরো নানা কথা। আমার হলিডেতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে কি না—এমন ইঙ্গিত করতেই সালেহা বলেন, আমার বয়স ৮০ বছর। না এমন কোনো ইচ্ছা আমার নেই। সালেহা ওকে দোষ দেবে না। সে অবাক হয়ে ভাবে, না বলে যাওয়ার পরও সালেহা এসব করে? ওর কি কোনো ইচ্ছা আছে? ও কি রিচার্ড আর ডরোথির মতো কোনো সবুজ দ্বীপে হলিডেতে যেতে চায়? ও আরো কিছু বলতে গেলে সালেহা চৌধুরী বলে, কথা দিলাম, আপনারা না থাকলে বিনগুলো ভেতরে এনে সাজিয়ে রাখব, আর আপনার সূর্যমুখী যাতে মারা না যায়, সেটা দেখব। বিন নিয়ে ভাববেন না।
ও মনে করেছে, আমি যে এটা করি, নিশ্চয় আমার কোনো ইচ্ছা আছে। আর এখানে ইচ্ছা মানে ‘এভরি রোড গোস টু রোম’। মানে ওরা ভাবছে আমি কি চাই! একেবারে বিনা স্বার্থে এমন করছি, ও বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ এ দেশ হলো সেই কথার দেশ, যেখানে বলে, ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু গেট ইনভলভড।’ ‘লাভ দাই নেইবার’—এমন কথা বলেছিলেন জিসাস ক্রাইস্ট। তবে সেটা কথার কথা। আমি প্রতিবেশীর জন্য এইটুকু করি, তাতে এমন কী হয়েছে? কিন্তু কেন করব?
তবে ১৬ নম্বর বাড়িতে মারলন থাকেন। কোনো সমস্যা নিয়ে দরজায় দাঁড়ালে সাহায্য করতে চেষ্টা করেন। তবে তিনি ইংরেজ নন। আমার দ্বিতীয় বইয়ের ‘ব্লার্ব’ তিনি লিখে দিয়েছেন। একটু ব্যতিক্রম তো থাকতেই হবে। না হলে আমরা প্রাণে বাঁচি কী করে? রিচার্ড একটু জানতে চেয়েছিলেন, আমার কোনো ‘ফন্ড উইশ’ আছে কি না। না, ওকে দোষ দেব না। এটা ব্রিটেন।
লেখক: লন্ডনপ্রবাসী কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক