আফগানিস্তানের বিপক্ষে ফিফা প্রীতি ম্যাচে অসাধারণ ফুটবল খেলেছেন উইং ব্যাক বিশ্বনাথ ঘোষ। শুধুই রক্ষণেই নয়, বিশ্বনাথ ঘোষ আক্রমণে গিয়ে আফগানিস্তানকে নাকানি চুবানি দিয়েছেন। ম্যাচ সেরা পুরস্কার দেওয়া হলে বিশ্বনাথ পেতেন সেই পুরস্কার। পুরস্কার না পেলেও দর্শকের ভালোবাসাটাই ছিল সেদিন বিশ্বনাথের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আফগানদের রক্ষণ কেঁচি দিয়ে কেটেছেন বিশ্বনাথ। কিন্তু ঐ যে ভাগ্য খারাপ। গোল করার কেউ নেই। বাংলাদেশ ফুটবল দলে এখন স্ট্রাইকার নেই। গোল করবে কে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে। ঢাকায় বসুন্ধরা কিংসের মাঠে প্রথম ম্যাচে গোল শূন্য, আর দ্বিতীয় ম্যাচে ১-০ তে পিছিয়ে থাকার পর ১-১ হয়। বাংলাদেশের গোলটি করেন শেখ মোসরালিন। আর এই গোলের পেছনের কারিগর বিশ্বনাথ ঘোষ।
আক্রমণে রাকিবের কাছ থেকে বল নিয়ে যেভাবে আফগানিস্তানের ফুটবলারদের কাটিয়ে ঢুকে পড়লেন, সেটা শেষ হলো গোল হজম করে। শেখ মোরসালিনের চেয়ে হাজার গুণ কৃতিত্ব বিশ্বনাথের। বিশ্বনাথ অকৃপণ ভাবে প্রতিবাদ করলেন,‘আমার চেয়ে ওর (শেখ মোরসালিন) অবদানই বেশি। এখানে একজনের কোনো কাজ না। আমাদের দলেরই খেলা এটা।’ আমি যেখানে সেই রাতে ম্যাচ শেষ করে বিশ্বনাথ চলে গেলেন গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে। মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই বিশ্বনাথের বাসা। প্রশংসার কথা মালা নিয়ে লোকের ভিড় বিশ্বনাথের কাছে। বিশ্বনাথের আফসোস,‘ ভালো করলে সবাই থাকে। আর খারাপ করলে কেউ আসে না। আসলে খারাপ সময়টায় বুস্টআপ করা উচিত।’ তাহলে কীভাবে খারাপ সময়টা কাটিয়ে ওঠেন বিশ্বনাথ,‘খারাপ সময় পাশে পরিবার থাকে। তারাই বুঝানো চেষ্টা করে।’
বাবা মায়ের কথা জানতে চাইলে বিশ্বনাথ বলেন, ‘দিলেন তো মনটা খারাপ করে। আমার বাবা রাজেন চন্দ্র ঘোষ মারা গেছেন ২০১২ সালে। বাবার কথা এভাবে মনে করতে চাই না। আমার বাবা মারা গেলেন আমি উনাকে দেখতেও পারিনি। মারা যাওয়ার পর কিছু কাজ থাকে। সন্তান হিসাবে সেটি করতে পারিনি।’ গতকাল সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের বাসা থেকে বিশ্বনাথ ফোনে কথা বলছিলেন। বারবার কথা তুলতেই বিশ্বনাথের কণ্ঠ নরম হয়ে আসল। গল্পটা তুলে ধরলেন বিশ্বনাথ,‘আমি ২০১২ সালে নেপালের খেলতে গিয়েছি। অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলের খেলা। দুই দিন পরই আমার বাবা মারা যান। আমাকে কেউ জানায়নি। কোচ ছিলেন নুরুল হক মানিক, আলতাফ হোসেন। আমি নেপালের বিপক্ষে ম্যাচে মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ছিলাম চার ঘণ্টা। নেপাল ট্যুর শেষ। আমাকে কিছুই বলা হয়নি। বাসায় কি হচ্ছে আমি কিছুই জানতে পারিনি। ঢাকায় ফিরে আমি যখন টাঙ্গাইলে যাই তখন আমাকে আমার আরেক কোচ আতিকুর রহমান জামিল, যদি কয়েক দিন আগে মারা গেছেন। সেই জামিল ভাই এসে আমাকে বাসায় নিয়ে যায়। তখন জানতে পারি বাবা মারা গেছেন। মায়ের অবস্থা খুবই খারাপ।’ দুই বছর এবং ৫ মাস বয়সের দুই কন্যা সন্তানের জনক বিশ্বনাথ।
মা সন্ধ্যা ঘোষ চাইতেন না ছোট ছেলে বিশ্বনাথ ফুটবল খেলুক। পছন্দই করতেন না। আর বাবাই ছিলেন বিশ্বনাথের ফুটবল প্রেরণা। বাবা চাইতেন বিশ্বনাথ দেশের ফুটবলে আলো ছড়াবে। কিন্তু দেখে যেতে পারলেন না তার ছেলে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের লালসবুজ পতাকা ওড়াচ্ছেন। আফগানিস্তানের কোচ আব্দুল্লাহ আল মুতাইরি বিশ্বনাথকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাবা নাই এখন মা-ই সব বিশ্বনাথের কাছে। ফুটবল খেলা অপছন্দ করা মা আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ দেখতে মাঠে গিয়েছিলেন। খুশি হয়েছেন প্রথম বার ছেলের খেলা দেখে। মা একটা কথাই বলেন বিশ্বনাথকে,‘মাথা গরম করিস না। সবাই বাসায় এসে বলে তুই মাথা গরম করিস মাঠে। এটা করিস না। এত কিছুর মধ্যে এখনো বারবার বাবার কথাও মনে পড়ে।’