মাওলানা এসএম আনওয়ারুল করীম
আলেমগণ হজের সফরকে পরকালের সফরের সাথে তুলনা করেছেন। কালের যাত্রীকে আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী-সন্তান সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হয়। হজ পালনকারী যখন হজের সঙ্কল্প করে বের হন, তখন পরকালের যাত্রীর ন্যায় এসব কিছু ত্যাগ করে যেতে হয়। পরকালের যাত্রীকে যেমন সাদা কাফনের কাপড় পরিয়ে খাটিয়ায় সাওয়ার করানো হয়, তেমনি হজযাত্রী মৃতব্যক্তির কাফনের ন্যায় ইহরামের দু’টুকরো শ্বেত শুভ্র সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করে যানবাহনে আরোহণ করেন। কেয়ামত দিবসে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো হজ পালনকারীর কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে— ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লা শারীকা লাকা লাব্বাইক; ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়ামাতা লাকা ওয়াল মুল্ক; লা-শারীকা লাক।’
হজের উদ্দেশ্যে মক্কা শরিফে প্রবেশ করা যেন ঐ জাহানে প্রবেশ করা- যেখানে রয়েছে শুধুই আল্লাহর রহমত। বায়তুল্লাহ শরিফের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা আরশে আজিমের চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সাফা ও মারওয়া সায়ী করা হাশরের ময়দানে দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করার ন্যায়। সূর্যের প্রচণ্ড খরতাপে আরাফার ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অবস্থান যেন হাশরের মাঠের সাদৃশ্য। হজের প্রতিটি আমলেই হাজীগণের সামনে রোজ কেয়ামতের চিত্র ভেসে ওঠে।
মহান আল্লাহর ইশক ও মহব্বত প্রকাশ করা এবং রুহকে প্রকৃত প্রেম ও ভালোবাসায় সিক্ত করার এক অপূর্ব দৃশ্য হজ। প্রেম আকর্ষণে মাতোয়ারা প্রেমিকের ন্যায় হাজীর অন্তরাত্মায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইশকের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। দারুণ আগ্রহ-উদ্দীপনায় হাজী সাহেবগণ তাঁর মহান দরবারে ভিড় জমান। আল্লাহ পাকও চান তাঁর ইশকে প্রেমিকগণ পাগল বেশে এভাবে তাঁর নিকট ছুটে আসুক। হাজীগণ আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে তাঁর ইশকে মাতোয়ারা হয়ে সেলাইবিহীন সাদা কাপড় পরিধান করে পাগল ও ফকিরের বেশে এলোমেলো চুল-দাড়ি নিয়ে মাঠ-ঘাট, পাহাড়-পর্বত, নদী, সাগর-মহাসাগর, বন-জঙ্গল, মরু প্রান্তর অতিক্রম করে চিত্কার দিয়ে লাব্বাইকা ধ্বনি উচ্চারণ করে ছুটে চলেন বায়তুল্লার উদ্দেশ্যে। পবিত্র মক্কা এবং মদিনায় পৌঁছে একজন হাজী মনে করেন যেন জান্নাতে পৌঁছে গেছি। তাদের আবেগ সমুদ্র এতটাই তরঙ্গায়িত হয়, যা’ বর্ণনা করা এবং অনুধাবন করা কঠিন। ইহরাম বাঁধা প্রকৃত প্রেমিক হওয়ার এক জ্বলন্ত নিদর্শন। হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া, মুলতাজামে কাবার গিলাফ জড়িয়ে ধরা, কাবার চৌকাঠে মাথা ঠুকে কান্নাকাটি করা, বায়তুল্লাহর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করা ইশকে ইলাহির অনুপম দৃশ্য। তারপর সাফা-মারওয়া দৌড়াদৌড়ি, মিনায় গমন, আরাফায় অবস্থান, খোলা আকাশের নিচে ধূলি-ধূসরিত কঙ্করময় মুজদালিফায় রাত্রি যাপন— প্রতিটি আমলেই আল্লাহর প্রেমের প্রতিফলন ঘটে। জামরাতে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি ও মাথা মুণ্ডানোর মাধ্যমে অনুরাগের শেষ মঞ্জিল অতিক্রম করে নিষ্পাপ শিশুর মতো হাজী সাহেবগণ নিজ মোকামে ফিরে আসলেও তাঁদের অন্তরে জ্বলতে থাকে পুনঃমিলনের অনির্বাণ শিখা।
রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও হজের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান সমস্যাসঙ্কুল বিশ্বে ইসলামের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলামি চিন্তাবিদগণ হজ মৌসুমে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন। হজ মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় চেতনায় উদীপ্ত হওয়ার এবং আপস, একতা ও সম্পর্ক স্থাপনের সিঁড়ি। হজের সমাবেশে ইসলামি জনতা, দেশ, জাতি, ভাষা, বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের মহান সুযোগ পায়। হজের পোশাক চাল-চলন সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থার নিদর্শন। মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে হজ একটি সার্থক এবং সফল আমল। এখানে ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির, সাদা-কালো, ভিন্ন শারীরিক কাঠামো, ভিন্ন ভাষার মানবজাতির একই বেশ ভুষা, একই আমল এবং একই স্থানে একত্রে জীবন যাপন। সারা বিশ্বের মানুষের সামাজিক জীবনব্যবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার, বিভিন্ন দেশের আলেম, জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য পাওয়ার বিশেষ সুযোগ এনে দেয় হজ। ইসলামের পবিত্র স্থান মক্কা মদিনায় ঐতিহাসিক বহু ইসলামিক নিদর্শন দর্শনসহ নবী করিম (স), তাঁর আওলাদ ও তাঁর সাহাবা কেরামের (রা) স্মৃতিসমূহ স্বচক্ষে দর্শনের অপূর্ব ব্যবস্থা হজ।
আদিমানব হযরত আদম ও তদীয় স্ত্রী হাওয়া (আ) সুদীর্ঘ সাড়ে তিনশ’ বছর পর্যন্ত কান্নাকাটির পর যে আরাফার ময়দানে তাদের পুনর্মিলন ঘটে তাতে হাজির হতে হাজীদের সে কি উত্তেজনা ও উন্মাদনা! এখানে পৌঁছে প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে মানুষ খোদায়ী প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে পড়েন। হযরত ইবরাহীম (আ) আল্লাহর হুকুমে মিনা মাঠে স্বীয় পুত্র ইসমাঈলকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। শয়তান তাদের উভয়কে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আল্লাহর প্রেমে মাতোয়ারা পিতা-পুত্র যথার্থভাবে ইলাহি নির্দেশ পালন করতে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে, সে স্মৃতি ধরে রাখতে আজও হাজীগণ প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে জামারায় গিয়ে প্রতীকী শয়তানের গায়ে পাথর মারতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এমনকি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেউ কেউ আবেগের আতিশয্যে জুতা-সেন্ডেল, লাঠি নিক্ষেপ করেন।
তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাঈলকে পানি পান করাতে মা হাজেরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালার কাছে সন্তানের প্রতি মায়ের নির্মল এ ভালোবাসার দৃশ্যটি এতটিই পছন্দের হয়ে পড়ে যে, তিনি তাবত্ পৃথিবীর হজযাত্রীদের জন্য এ ছুটোছুটিকে আবশ্যকীয় করে দেন। তাই প্রতিবছর হজ এসে আমাদেরকে ইলাহি প্রেমে মাতোয়ারা হওয়ার সবক দিয়ে যায়।
lলেখক : আলোচক, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন; বিভাগীয় প্রধান (হাদীস), আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স