ঘনঘন লোডশেডিংয়ে চা উৎপাদন ব্যাহত

বৈরী আবহাওয়া তথা অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে গত বছরের চেয়ে এখনো চা উত্পাদনে পিছিয়ে আছে চট্টগ্রামের ২২টি বাগান। এ বাগানগুলোতে গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কেজি চা কম উত্পাদন হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক স্বাভাবিক বৃষ্টিতে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছুটা আশার আলো দেখা দিলেও ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে চা তৈরি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চা-মৌসুম শুরু হয় মার্চ মাসে। মৌসুমের শুরুর বৃষ্টিকে ‘আশীর্বাদ’ বলে মনে করেন বাগানসংশ্লিষ্টরা । মূলত মার্চের বৃষ্টিতে চা-গাছে কুঁড়ি আসতে শুরু করে । নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তবে সর্বোচ্চ চা উত্পাদন হয় জুলাই ও আগস্ট মাসে। এবার মার্চ হতে জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টির পরিমাণ ছিল খুবই কম। আবার আগস্টে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয়। বাংলাদেশ চা সংসদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ বছরের আগস্ট মাসেই বৃষ্টি হয় ৩৬ দশমিক ০১ ইঞ্চি। অথচ বর্ষার শুরু থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয় মাত্র ২৮ দশমিক ৩৩ ইঞ্চি। আর ২০২২ সালের আগস্টে বৃষ্টিপাত হয় ৫ দশমিক ৭১ ইঞ্চি এবং বর্ষার শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩৮ দশমিক ৩২ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। 

ফটিকছড়ির অন্যতম বৃহত্ বাগান উদালিয়া চা-বাগানের সিনিয়র ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চায়ের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত অত্যাবশ্যক। অনাবৃষ্টিতে যেমন চা উত্পাদন ব্যাহত হয়, তেমনি অতিবৃষ্টিও চায়ের জন্য ক্ষতিকর। তিনি আরো বলেন, মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টি ও প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে বাগানগুলোতে এবার ‘রেড স্পাইডার’ ও ‘হেলোফিলিটস’ মশার আক্রমণ ছিল অনেক বেশি। এ মশাগুলো চা-গাছের নতুন কুঁড়ি খেয়ে ফেলে। তিনি বলেন, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে এ বছর আশানুরূপ চা উত্পাদিত হচ্ছে না। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের এ পর্যন্ত  বাগানগুলো অনেক পিছিয়ে আছে। ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত উদালিয়ায় উত্পাদন হয় ৪ লাখ ৯২ হাজার ৫ কেজি। আর এ বছর হয়েছে ৪ লাখ ৪ হাজার ৩৪৬, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কেজি কম। চা সংসদের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের ২২টি চা-বাগানের সবগুলোরই একই অবস্থা। যেমন, ফটিকছড়ির কর্ণফুলী বাগানে উত্পাদন কমেছে ১ লাখ ২ হাজার ৮০৫ কেজি, নেপচুনে ৭০ হাজার ৩০৭ কেজি।

চায়ের এই ভরা মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ চা সংসদ ও চা বোর্ড থেকে বিদ্যুত্ বিভাগকে আগাম পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যুত্ বিভাগ এতে ন্যুনতম গুরুত্বও দেয় না। ফলে চায়ের এ ভরা মৌসুমে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বাগানগুলোর এখন চরম দুরবস্থা। রামগড় চা-বাগানের রের্কড অনুযায়ী গত জুন-জুলাইয়ে লোডশেডিং ছিল গড়ে দৈনিক ৮ ঘণ্টা, আগস্টে ৬ ঘণ্টা। জুন, জুলাই, আগস্টে দৈনিক সর্বোচ্চ ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের শিকার হতে হয় বাগানগুলোকে। রামগড় চা-বাগানের সিনিয়র ব্যপস্থাপক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমার দৈনিক বিদ্যুত্ চাহিদা ৮০০ কিলোওয়াট। কিন্তু পাচ্ছি ৬০০ কিলোওয়াট। ফলে বিদ্যুিবহীন সময়ে কারখানা সচল রাখতে ব্যবহার করতে হয় ডিজেল। প্রতি ঘন্টায় ডিজেল পুড়ে ৬৫-৭০ লিটার। এখন এক লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা। তিনি আরো বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে চা তৈরিতে গুণগত মান বজায় রাখা যাচ্ছে না। কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

বাগান কর্মকর্তারা জানান, চায়ের উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও নিলাম বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম ওঠেনি। এতে অধিকাংশ চা-বাগানকে লোকসান গুণতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফটিকছড়ির এক চা-বাগান ম্যানেজার বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে চায়ের উত্পাদন খরচ প্রতি কেজি প্রায় ২৫০ টাকা পড়ছে। গত ৩১ জুলাই চট্টগ্রামের নিলাম বাজারে চায়ের গড় মূল্য ছিল ২০৮ টাকা ৫৮ পয়সা।