লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে অবাধে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে এই বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে ভাঙন দেখা দিতে পারে সেচ প্রকল্পের বাঁধে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলন কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হলেও কোনোভাবেই মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না।
এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা বর্ষা মৌসুমে শেষে এর প্রভাবে (বালু উত্তোলনে) ভাঙন বাড়বে নদীতে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয়রা। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা দেখা যায়নি। অনেকটা নীরব ভূমিকায় রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে, উপজেলার উত্তর, দক্ষিণ চরবংশী ও চরআবাবিল ইউপির মেঘনা নদীর ৩০ কিলোমিটার নৌ-সীমানায় প্রায় ১৫টির মতো বেশি চর রয়েছে। মেঘনা নদীর ডুবোচর খননের নামে জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাসহ বেশ কয়েকজন অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে চরাঞ্চল ও রক্ষা বাঁধকে ভাঙনের হুমকিতে রেখেছে। সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের পকেট ভারি করতে তারা নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করছেন। দক্ষিণ চরবংশী ইউপির পানিরঘাট, ভাংগাটেক জায়গায় ইউপি সদস্য দিদার মোল্লা ও তার বড় ভাই স্থানীয় আ.লীগ নেতা মনির হোসেন মোল্লা ও দুলাল সৈয়াল, মিয়ারহাটে (রাহুলঘাট) হাসেম চৌকিদার, বাবুল ব্যাপারি, সৈয়লগো বাজারের মোতালেব সৈয়াল, ভায়রা ঘাটে মামুন ও হাজিমারা স্লুইসগেট খালপাড় এলাকায় জামাল, জুলহাস মোল্লা, ফারুখ সৈয়ালসহ আলতাফ মাস্টারের ঘাটের পশ্চিম পাড়ে প্রভাবশালী দুই বালু দস্যু। উত্তর চরআবাবিল ইউনিয়নের তুলাতুলি স্থানে আমির হোসেন, সোহেল হাওলাদার, আরিফুর রহমান মিস্টার, শহর আলী মোড়ে হারুন খাঁ ও পুরান বেরির পূর্ব মাথায় মোহাম্মদ আলী খাঁ ও আলমগীর ব্যাপারী ও তালতলায় বিল্লাল কবিরাজ ও ঝাউডুগি গ্রামের মো. কামাল ও আনোয়ার। দীর্ঘদিন যাবৎ বালু উত্তোলন করার কারণে তীব্র ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে চরের আশ্রয়ণ প্রকল্প, মেঘনার সেচ প্রকল্পের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার বাড়ি-ঘর ও ফসলি জমি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ ও উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যক্রর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভাঙন রোধ করা যাবে না।
চরবংশী ইউনিয়নের আরিফ, আনোয়া, লেদু মিয়াসহ ৮-১০ জন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তারা অবৈধভাবে কাজটি করে যাচ্ছেন। এতে পানির প্রবাহে গতি পরিবর্তন হওয়ায় নদীর পাড় ভেঙে এলাকার ফসলি জমিসহ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। তবে বালু উত্তোলনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না।’
প্রবীণ বাসিন্দা রফিক মাঝি বলেন, ‘আমার তিন কানি জমি ছিল। এর মধ্যে দুই কানি জমির মাটি ভেঙে নদীতে চলে গেছে। আমি ছাড়াও অন্যান্য মানুষের ফসলি জমিও চলে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন যদি এ বালু উত্তোলন বন্ধ করে তাহলে আমাদের জীবনটা বাঁচবো।’
জানতে চাইলে দক্ষিণ চরবংশি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মনির মোল্লা সাংবাদিকদের সঙ্গে বলেন, ‘বালু তুলি বলেই মানুষ সেখানে বাড়িঘর তুলে বসবাস করে। চরইনদুরিয়া গ্রামের বালুদস্যু বিল্লাল কবিরাজ বলেন, নদী ছাড়া পুকুর, ডোবা-নালা ও ফসলি জমি থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।’
স্থানীয় চেয়ারম্যান আবু ছালে মিন্টু ফরাজী বলেন, ‘মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা সাধারণত যেখানে-সেখানে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করেন। এ কারণে তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালু উত্তোলনকারীদের কাছে আমিও অসহায়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন দাশ জানান, ‘অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রায়ই উপজেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে আসছে। গেল এক বছরে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে আবারও যত দ্রæত সম্ভব কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’