যেভাবে চলে ডিমের বাজার 

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখে "ডেইলি স্টার" পত্রিকায় কল্লোল মুস্তফা একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, যেখানে তিনি "প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দাম কীভাবে কারসাজি হয়" নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই প্রবন্ধে মোস্তফা ডিম শিল্প এবং আমাদের কোম্পানি কাজী ফার্মস লিমিটেড সম্পর্কে ভুল এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন।

ডিমের দামের হেরফের প্রসঙ্গে মোস্তফা লিখেছেন, দিনাজপুরে নর্থ এগস্ ও কাজী ফার্মস যৌথভাবে ডিমের দাম নির্ধারণ করে। বক্তব্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। দিনাজপুরে কাজী ফার্মসের কোনো ডিম বিক্রয় প্রতিনিধি বা ডিম বিক্রয় কেন্দ্র নেই, তাই সেখানে ডিমের দাম নির্ধারণ করার কোনো উপায়ই আমাদের নেই। নর্থ এগ্জ একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান; আমরা নর্থ এগজের সাথে বা অন্য কারো সাথেই যৌথভাবে ডিমের দাম নির্ধারণ করি না।

প্রতিদিন হাজার হাজার ক্ষুদ্র খামারি ডিম বিক্রি করেন। হাজার হাজার ব্যবসায়ী তা কেনেন এবং প্রতিদিন বিক্রি করেন। একজন ব্যবসায়ী একটি নির্দিষ্ট গ্রামীণ এলাকার কিছু খামার থেকে ডিম কেনেন। প্রথম ব্যবসায়ী দ্বিতীয় ব্যবসায়ীর কাছে সেই ডিম বিক্রি করেন, যিনি এরপর একটি নির্দিষ্ট শহরের খুচরা দোকানে সেই ডিম সরবরাহ করেন। ব্যবসায়ীরা সর্বনিম্ন দামে ডিম কেনার চেষ্টা করেন। কোনো ডিম উৎপাদনকারী যদি দিনের বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রি করার চেষ্টা করেন, তবে ব্যবসায়ীরা সেই খামারির কাছ থেকে ডিম কিনবেন না। সুতরাং ডিমের দাম একটি বড় "সিন্ডিকেট" (কার্টেল) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এমন দাবি করা হাস্যকর। চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ডিমের বাজার মূল্য নির্ধারণ করা হয়।।

ডিমের নিলাম প্রসঙ্গে মোস্তফা লিখেছেন, "ডিরেক্টরেট অফ ন্যাশনাল কনজিউমার রাইটস প্রোটেকশন (ডিএনসিআরপি) এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছর আগষ্ট মাসে বড় ডিম উৎপাদক সংস্থাগুলি নিলামের সময় দামে কারসাজি করার জন্য এজেন্ট নিয়োগ করেছিল।" ডিএনসিআরপি’র এই অভিযোগ ছিল ২০২২ সালের আগস্টে ডিমের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে। ২০২২ সালের আগস্টে হঠাৎ ডিজেলের মূল্য বেড়ে যায় এবং এই মূল্য বৃদ্ধির জের ধরে ট্রাক ধর্মঘট শুরু হয়, যা পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে। সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ডিম, মাছ, এবং সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। ডিমের বাজার মূল্যে বৃদ্ধিতে নিলামে ডিম ক্রেতারা বেশি দামে বিড করেন ফলে ডিমের দামও বেড়ে যায়। এখানে কোন কারসাজির বিষয় ছিলনা।

বাজার ক্লিয়ারিং মূল্য নির্ধারণ করতে প্রতিদিনই ডিমের নিলাম হয়। একটি উদাহরণ দেই-ধরুন কোন এক নির্দিষ্ট দিনে আমাদের আশুলিয়া বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রির জন্য ৬,০০,০০০ টি ডিম আছে। ধরে নিলাম, প্রতিটি ডিমের প্রাথমিক প্রস্তাবিত মূল্য হয় ১০.০০ টাকা। তখন এই প্রারম্ভিক প্রস্তাবিত মূল্যের উপরে প্রত্যেক ক্রেতা তাদের ডিমের পরিমাণ উল্লেখ করে মূল্য প্রস্তাব (বিড) করেন। 

ধরুন আমরা নিম্নলিখিত বিডগুলি পেয়েছি:

ক: ১,০০,০০০ ডিমের জন্য ডিম প্রতি ১১.০০ টাকা।
খ: ২,০০,০০০ ডিমের জন্য ডিম প্রতি ১০.৩০ টাকা। 
গ: ১,০০,০০০ ডিমের জন্য ডিম প্রতি ১০.২৫ টাকা।
ঘ: ২,০০,০০০ ডিমের জন্য ডিম প্রতি ১০.২০ টাকা।
ঙ:  ২,০০,০০০ ডিমের জন্য ডিম প্রতি ১০.১৫ টাকা।
চ: ২,০০,০০০ ডিমের জন্য ডিম প্রতি ১০.১০ টাকা।

উচ্চতম চারজন দরদাতার (ক, খ, গ এবং ঘ)  মোট ডিমের চাহিদা ৬,০০,০০০, যা আমরা ঐ দিন বিক্রির চেষ্টা করছি। চতুর্থ উচ্চতম দরদাতা ‘ঘ’ ডিম প্রতি ১০.২০ টাকা প্রস্তাব করেছেন। তাই সেই দিন আমাদের বিক্রয় মূল্য হবে ডিম প্রতি ১০.২০ টাকা (চতুর্থ উচ্চতম দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্য)। চারজন সর্বোচ্চ দরদাতা, 'ক', ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’, তাদের চাহিদা অনুযায়ী ডিম পাবেন। তাঁরা সবাই ডিম প্রতি ১০.২০ টাকা হারে ক্রয় করবেন, আর আমাদেরও ওইদিনের সব ডিম বিক্রি হয়ে যাবে। দুই কম দরদাতা, ‘ঙ’ এবং ‘চ’ , ঐদিন আমাদের কাছ থেকে কোনো ডিম পাবেন না।

এখানে আমাদের বিক্রয় মূল্য কিন্তু আমাদের পাওয়া সর্বোচ্চ প্রস্তাবিত মূল্য নয়। উল্লেখিত উদাহরণে, সর্বোচ্চ প্রস্তাবিত দাম ছিল ১১.০০ টাকা (ক এর প্রস্তাব), তবে বিক্রয় মূল্য ছিল ১০.২০ টাকা। আমরা যদি ১১.০০ টাকায় ৬,০০,০০০ ডিম বিক্রি করার চেষ্টা করতাম তবে সেদিন সব ডিম বিক্রি হত না। আমরা অবিক্রিত ডিম রাত রাখা এড়াতে চেষ্টা করি। কারণ  ডিমের মত পচনশীল একটি পণ্য আমরা এক রাতও অবিক্রীত রাখার ঝুঁকি নিতে পারিনা।

নিলামে কৃষিপণ্য বিক্রি কোন ব্যতিক্রম বিষয় নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতিদিনই গবাদি পশুর নিলাম হয়। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার প্রতিটি রাজ্যে নিলামের মূল্য সহ একটি ওয়েবসাইট (USDA Feeder and Replacement Cattle Auction) পরিচালনা করে। বাংলাদেশে চা নিলামে বিক্রি হয়। 

মোস্তফার মত অনেকেই ডিম উৎপাদকদের সমস্যা সমূহ বুঝতে পারছেন না। এখানে খামারিরা অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি। ফিডের উচ্চ মূল্যের কারণে অনেক চাষি তাদের খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ডিমের উৎপাদন কমে গেছে এবং এর প্রভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি ডিমের দামে। ডিমের সংকটই তাই এখন ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ। আমদানি করে ডিমের দাম কমানোর পদক্ষেপ একটি স্বল্পমেয়াদি সমাধান। আর আমদানির কারণে যদি ডিমের দাম কমে যায়, আরও অসংখ্য ক্ষুদ্র খামারি হয়ত তাদের খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।

                                                                                                                                                                  কাজী জাহিন হাসান

                                                                                                                                                            পরিচালক, কাজী ফার্মস