বর্ষায় খেয়া নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকোতে চলে বংশাই নদে পারাপার। পারাপারের একমাত্র ভরসা খেয়া নৌকা ও বাঁশের সাঁকোতে এভাবেই চলছে ৫৩ বছর। প্রত্যাশার ৫৩ বছরেও শেষ হয়নি এলাকাবাসী প্রতীক্ষা।
প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে নদ পার হচ্ছে বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী, শিক্ষার্থী ও পথচারিরা। সেতুটি নির্মিত না হওয়ায় দুর্ভোগে রয়েছেন তিন উপজেলার কমপক্ষে ৩৫ গ্রামের মানুষ। বংশাই নদের দু’পাশে তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী কাউলজানী ও কালিয়ান বাজার। খেয়াঘাটে সেতু নির্মাণের দাবি এলাকাবাসী দীর্ঘদিনের।
জানা গেছে, সখীপুর ও বাসাইল উপজেলা মিলে টাঙ্গাইল-৮ সংসদীয় আসন। একই আসনের সখীপুর উপজেলা থেকে বাসাইল উপজেলার মানুষের সেতুবন্ধন বংশাই নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন। বাসাইলঘেঁষা কালিহাতী উপজেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশও সখীপুর উপজেলা থেকে এ নদে বিভক্ত। তিনটি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খেয়াঘাটের মধ্যে ‘কাউলজানী বাজার-কালিয়ান’ খেয়াঘাটটি অন্যতম। সখীপুর উপজেলার পশ্চিম এলাকা কালিয়ান, বাসাইল উপজেলার পূর্ব-উত্তর এলাকা কাউলজানী এবং কালিহাতী উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা গান্ধিনা। তিনটি উপজেলার ‘মোহনা’ কাউলজানী বাজার-কালিয়ান এলাকা ‘বংশাই নদ’ দ্বারা বিভক্ত রয়েছে। বংশাই নদে সেতু না থাকায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন ওই তিন উপজেলার মানুষ।
খেয়াঘাট দিয়ে পারাপার হয় যে সব গ্রামের মানুষ তার মধ্যে হচ্ছে নদের পূর্বপাড় সখীপুর উপজেলার কালিয়ান, দাড়িয়াপুর, গড়গোবিন্দপুর, চাকলাপাড়া, কৈয়ামধু, বেতুয়া, দেওবাড়ী, প্রতিমাবংকী, ছোটমৌশা, লাঙ্গুলিয়া, সিলিমপুর ও শালগ্রামপুর। নদের পশ্চিমপাড় বাসাইল উপজেলার গ্রামগুলো হচ্ছে কাউলজানী, বাদিয়াজান, মান্দারজানী, খাটরা, ফুলকী, মলিয়ানপুর, বিলচিকনাই, ঝনঝনিয়া, বালিয়া, ময়থা, কলিয়া, তিরঞ্চ ও আইসড়া এবং কালিহাতী উপজেলার গান্ধিনা ও পলাশতলীসহ ৩৫টি গ্রাম।
সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে ওই খেয়াঘাটে কথা হয় কালিয়ান গ্রামের বাসিন্দা কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জানান, এলাকার মানুষের স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতার পর এ নদের উপর একটি টেকসই সেতু নির্মাণের। এটি সকলের প্রাণের দাবি। ৫৩ বছর পার হলেও সাধারণ মানুষের সেই দাবি এখনও পূরণ হয়নি, শেষ হয়নি প্রতীক্ষার। ৫০-৬০ মিটার সেতুর জন্য অতিরিক্ত ঘুরতে হয় কমপক্ষে ১৫-২০ কিলোমিটার সড়ক। এলাকার শিক্ষার্থীরাও প্রতিনিয়ত বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার পথে ঝুঁকি নিয়ে নদ পারাপার হচ্ছে। নদের দু’পাড়ের কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। অনেক সময় সাঁকো বা খেয়া নৌকায় মুমূর্ষু রোগী পারাপার করে হাসপাতালে পৌঁছানোও সম্ভব হয় না। ডিজিটাল যুগে এ ধরনের দুর্ভোগ খুবই অসহনীয়।
নদের পূর্বপাশে সখীপুর উপজেলার কালিয়ান গ্রামে রয়েছে সাপ্তাহিক হাট, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দাখিল মাদ্রাসা। অন্যদিকে নদের পশ্চিমে বাসাইলের কাউলজানী গ্রামে রয়েছে সাপ্তাহিক হাটসহ দুইটি বাজার, বালিকাসহ দুইটি উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
নৌকার মাঝি নরেন তরুণী দাস জানান, বর্ষার ছয়মাস খেয়ায় ও শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের তৈরি সাঁকোই পথচারিদের নদ পারাপারের একমাত্র মাধ্যম। হাট-বাজারের দিনে সদাইপাতি নিয়ে হাটুরেদের কী যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে হয়; এটি ভাষায় প্রকাশ করা যায়না। আবার মধ্যরাতে দূরের লোকজন খেয়াপাড়ে আসলে তখন তাদের বিপদের সীমা থাকে না।
কালিয়ান গ্রামের বাসিন্দা সমাজসেবক তুহিন সিদ্দিকী বলেন, সেতু না থাকায় এলাকার মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগে পোহাতে হচ্ছে। রোগী নিয়ে স্বজনরা দারুণ অসুবিধায় পড়ে থাকেন।
কাউলজানী ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য শেখ শাহীন বলেন, বাসাইলের কাউলজানী ও সখীপুর উপজেলায় আমাদের বসতবাড়ি ও আবাদি জমি আছে। প্রতি নিয়ত দুইটি উপজেলাতে যাতায়াত করতে অতিরিক্ত ১৮-২০ কিলোমিটার করে বেশি ঘুরতে হয়।
ঘাটপাড়ের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, সখীপুরের ভূ-খণ্ড দুভাগে বিভক্ত। নিচু ও পাহাড়ি সমতল এলাকা। সেতুর অভাবে থেমে আছে নিচু এলাকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা। সেতুটি নির্মাণে নির্বাচনের আগে অনেকেই জনপ্রতিনিধিই প্রতিশ্রুতি দেন, পরে কেউ তা মনে রাখেন না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুল বাছেদ বলেন, সেতুটি নির্মাণে ১০০ মিটার অনুর্ধ্ব ব্রিজের প্রকল্পে প্রস্তাব পাঠানো আছে। অনুমোদনের চিঠি পেলেই সেতুটি নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু করা হবে।
টাঙ্গাইল-৮ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জোয়াহেরুল ইসলাম জানান, সেতুটি নির্মাণের প্রতীক্ষা দীর্ঘদিনের। প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চেষ্টা করছি, এ সরকারের আমলেই দরপত্র আহŸান করে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করার।