অর্থ-বিত্ত সকলেই চাহে। সকলে সচ্ছল-স্বাচ্ছন্দ্য ও বৈভবময় জীবন চাহে। সম্পদ অর্জনের লোভ সকলেরই। বলা হয় যে, ‘লোভ’ হইল আধুনিক সমাজের চালিকাশক্তি; কিন্তু উহার লাগাম থাকা প্রয়োজন। যদি লাগাম না থাকে, তাহা হইলে তিনি সীমা লঙ্ঘনের জন্য বিপদে পড়িবেনই। দেখা গিয়াছে, পৃথিবীতে যত বিবাদবিসংবাদ-অনাসৃষ্টি হইয়াছে, তাহা ঘটিয়াছে সীমা লঙ্ঘনের কারণেই। এই জন্য বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, কোনো মানুষ যদি তাহার লোভের দাঁড়ি-কমা না টানিতে পারেন, তাহা হইলে তিনি পাগল হইয়া যাইবেন। এই ব্যাপারে ‘পথের সঞ্চয়’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চমত্কার কিছু দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘একদিন মানুষ ছিল বুনো, ঘোড়াও ছিল বনের জন্তু। মানুষ ছুটিতে পারিত না, ঘোড়া বাতাসের মতো ছুটিত। মানুষ চাহিয়া দেখিত, আর তাহার ঈর্ষা হইত। সে ভাবিত, “ঐরকম বিদ্যুত্গামী চারটে পা যদি আমার থাকিত তাহা হইলে দূরকে দূর মানিতাম না, দেখিতে দেখিতে দিগিদগন্তর জয় করিয়া আসিতাম।” মানুষ শুধু শুধু লোভ করিয়া বসিয়া থাকিবার পাত্র নহে। একদিন সে ফাঁস লাগাইয়া বনের ঘোড়াকে ধরিল। কেশর ধরিয়া তাহার পিঠের উপর চড়িয়া বসিয়া নিজের দেহের সহিত ঘোড়ার চার পা জুড়িয়া লইল। এই চারটি পাকে সম্পূর্ণ নিজের বশ করিতে তাহার বহুদিন লাগিয়াছে, সে অনেক পড়িয়াছে, অনেক মরিয়াছে; কিন্তু কিছুতেই দমে নাই।’
মানুষ নিশ্চয়ই দমিবার পাত্র নহে। যতটুকু মানুষের প্রয়োজন, ততটুকুর তো অবশ্যই সংস্থান করিতে হইবে; কিন্তু অনেকেই রহিয়াছেন, যাহারা লোভের দাঁড়ি-কমা না টানিয়া এমন সকল অপরিণামদর্শী কাজ করেন, যাহা দেখিয়া মনে হইতে পারে—তিনি বা তাহারা যেন শয়তান দ্বারা চালিত। তাহারা অত্যন্ত গোপনে এমন সকল কাজ বা পরিকল্পনা করিতে চাহেন—যাহার পরিপ্রেক্ষিতে মনে করেন—পৃথিবীর কেহ দেখে নাই। তাহারা মনে করেন, তাহারাই সবচাইতে বড় পরিকল্পনাকারী; কিন্তু তাহারা যেন ভুলিয়া যান সুরা আনফালের ৩০ নম্বর আয়াত—‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সবচাইতে উত্তম পরিকল্পনাকারী।’ মনে রাখিতে হইবে, মহান সৃষ্টিকর্তার নিয়ামত ছাড়া শুকরিয়া ব্যতীত কেহ কোনো কিছু অর্জন করিতে পারেন না; কিন্তু কাহারো অনিয়ন্ত্রিত ‘লোভ’ যদি সীম লঙ্ঘন করে, তখন তাহার পরিণতি কী হইতে পারে—বিশ্বসাহিত্যে ইহা লইয়া একটি বিখ্যাত গল্প রহিয়াছে। বিশ্বখ্যাত লেভ তলস্তয় তাহার ‘সাড়ে তিন হাত জমি’ গল্পে দেখাইয়াছেন আদিগন্ত বিপুল ভূমি ক্রয় করিতে গিয়া পাখোম কীভাবে মারা গিয়াছিলেন জমি দখলের একদম শেষ মুহূর্তে। জমি ক্রয়ের শর্ত ছিল, পাখোম সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতখানি হাঁটিবেন, ততখানি জমির মালিক হইবেন তিনি; কিন্তু অধিক জমি পাইবার অনিয়ন্ত্রিত লোভে পাখোম ক্রমশ এত দূর অবধি চলিয়া গেলেন যে, সূর্যাস্তের পূর্বে মূল জায়গায় ফিরিয়া আসিবার অন্তিমক্ষণে তাহার মৃত্যু হয়। আর মৃত্যুর পর তাহার কবরের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ‘সাড়ে তিন হাত জমি’।
সুতরাং নিজেকে সংবরণ করিতে হইবে। সময়মতো নিজেকে সংবরণ করিতে না পারিলে প্রতিটি সীমালঙ্ঘনকারীর অবস্থা হইবে ‘সাড়ে তিন হাত জমি’ গল্পের পাখোমের মতো। তিনি বিশাল সম্পদের অধিকারী হইবেন ঠিকই; কিন্তু সেই সম্পদ তাহার ইহকালে কিংবা পরকালে কোনো কাজেই লাগিবে না। ইহার সহিত সংবরণ করিতে হইবে নিজের জিহ্বাকে। বিশেষ করিয়া যাহারা যত বড় পদে আসীন, তাহাদের জিহ্বা তত অধিক স্পর্শকাতর। মনে রাখিতে হইবে নিজের মৃত্যুর কথা। আমরা কেহই জানি না আজই আমাদের শেষ দিন কি না। রাতে যখন ঘুমাইতে যাইব, আমরা জানি না, এই ঘুম আর কখনো ভাঙিবে কি না। ঘুম ভাঙিলে সকাল, না ভাঙিলে পরকাল। এই সারসত্যটি শয়নে-স্বপনে স্মরণ রাখিতে হইবে। ইহার সহিত মনে রাখিতে হইবে, আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার ক্রীড়নক মাত্র। আমাদের পরিকল্পনার কোনো মূল্যই নাই। সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী একমাত্র মহান আল্লাহ।