শিক্ষা মানব সমাজের অমূল্য সম্পদ। শুধুমাত্র উন্নত চিন্তা ও শিক্ষা গ্রহণের কারণেই মানুষ বিশ্ব শাসন করার ক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন করেছে। বন্যদশা থেকে আধুনিক সমাজ পর্যন্ত মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে বিবর্তন ধারা অব্যাহত রেখেছে, তৈরি হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা। যা দাঁড়িয়ে আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর। এই নীতি ও ব্যবস্থার প্রধান উপকরণ হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক।
শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ‘ইউনেস্কো’ ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বিশ্বের ১০০টি দেশ শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ১৯৯৫ সাল থেকে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে আসছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস, শিক্ষকদের মর্যাদা, দায়িত্ব ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কেমন হবে- বিষয়গুলো নিয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা হয় কয়েকজন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, একজন শিক্ষক যেন কোনো বৈষম্য ছাড়া তার পেশাগত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারে সেরকম পরিবেশ কাম্য। এর জন্য শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো এবং আর্থিক নিশ্চয়তা জরুরি। বিশেষকরে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের গ্রেড সাউথ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো উচিত। একজন শিক্ষার্থীর চোখে শিক্ষক মর্যাদাপূর্ণ হলে সেই শিক্ষার্থী অবশ্যই সেটা প্রকাশ করবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকের দায়িত্ব বেশি।
তিনি আরো জানান, অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের দায়িত্বের বিষয়ে উদাসীন দেখা যায়। এর কয়েকটি কারণ- অনিচ্ছা অথবা যথাযথ যোগ্যতা না থাকা সত্বেও জোর করে শিক্ষকতা পেশায় যাওয়া। শিক্ষকের পদমর্যাদা, সম্মান ও পদন্নোতি যদি যোগ্যতা ভিত্তিক না হয়ে তোষামোদি বা দুর্নীতির মাধ্যমে হয়, তাহলে একজন শিক্ষক সেই স্রোতেই গা ভাসাতে পারেন।আবার পরিবেশ ঠিক থাকলেও, অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা এবং পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবের কারণে অনেকে সঠিক কাজটি করতে পারেন না। এছাড়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক অন্যসব সম্পর্কের মতো স্বাভাবিক, ন্যায্যতা ভিত্তিক, সহমর্মী হলেই হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক নিয়ে আলাদা করে কোনো 'গল্প' অপ্রয়োজনীয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর নিউটন হাওলাদার জানান, শিক্ষক হলেন জাতি গঠনের কারিগর। শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড। আর এই জাতির মেরুদণ্ডের শক্ত ভিত তৈরি করেন একজন শিক্ষক। সব শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া উচিত। একজন শিক্ষক এই মহান পেশায় থেকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। মর্যাদার দিক দিয়ে শিক্ষকদের অবস্থান সর্বোচ্চ স্থানে থাকা উচিত। শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষকরা গর্ববোধ করেন।
তিনি বলেন, আসলে শিক্ষকতা একটি সম্মানিত ও মহান পেশা। তাই যে শিক্ষার্থী প্রকৃত ও আদর্শিক শিক্ষা গ্রহণ করবে সে শিক্ষার্থী শিক্ষককে অবশ্যই মর্যাদা দেবে। সেক্ষেত্রে শিক্ষককে নিজেই তার অবস্থান তৈরি করতে হবে। শিক্ষকের নৈতিকতা, আদর্শিকতা ও ম্যানার পর্যবেক্ষণ করেই একজন শিক্ষার্থী তার আত্মমর্যাদা বোধকে সন্মান করার নৈতিকতা শিখবে। আর মর্যাদা না পাওয়ার কারণ স্ব-স্ব শিক্ষকের আদর্শিক ও নৈতিক স্খলনই দায়ী।
তিনি আরো বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন। শিক্ষকের চাওয়া পাওয়া তার শিক্ষার্থীর সার্বিক ও নৈতিক জ্ঞানে পারদর্শী করানোর মধ্যেই নিহিত থাকে। শিক্ষকতা পেশায় সম্মানটাই অধিক। এখানে শিক্ষার্থীদের ও সম্মান আছে। শিক্ষার্থীদের সম্মান সুলভ ম্যানার শিখানো শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব। যদি গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ভালো না থাকে তা হলে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে অগ্রগতি বা উন্নত চিন্তাভাবনা বিকাশ করা সম্ভব হবে না। আমার মতে স্রেফ ফ্রেন্ডলী।
কবি ও সাংস্কৃতিককর্মী নাঈম রাজ এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত সরলীকরণ করাটা বড়ই জটিল ও অম্ল-মধুর। যেখানে আমরা সুন্দর পুষ্পকানন যেমন দেখি ঠিক তার বিপরীতে হতাশার বিষাদও খুব কম নয়। এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে শুধুমাত্র পবিত্র সুবাস থাকার কথা ছিলো কিন্তু তাতে বিষাদ গ্লানির আবরণ কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বর্তমানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রধানত উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, শিক্ষক জাতির মস্তিষ্কের স্রষ্টা। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয় তবে বুঝতে হবে মস্তিষ্ক তৈরির স্রষ্টার মস্তিষ্কে পচন ধরেছে। সেই মস্তিষ্কের পুনর্গঠন প্রয়োজন। মাঝে মধ্যেই শিক্ষককে লাঞ্ছনার শিকার হতে হত। বিষয়টা বৃহৎ পরিসরে দুঃখজনক। আবার শিক্ষার্থীরা শিক্ষক কর্তৃক মাঝে মধ্যেই অন্যায় নির্মমতা এবং জুলুমের শিকার হন, যা অপ্রত্যাশিত ও ভয়ংকরও বটে। একজন শিক্ষক শুধুমাত্র তার নৈতিকতায় দায়বদ্ধ থাকেন। আবার, কিছু শিক্ষার্থীদের মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে মানবিক অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়। এর দ্বায় পারিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী আমজাদ হোসেন জানান, প্রত্যেক শিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীর শিক্ষার প্রতি অনুরাগ জাগ্রত করা শিক্ষার্থীদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়া এবং বাস্তব ও সত্য অনুসন্ধানে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা। শিক্ষকের আরেকটি পবিত্র দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা। আর এই দায়িত্ব পালন করতে হলে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু কতিপয় শিক্ষকের অপকর্ম, অদক্ষতা, স্বজনপ্রীতি, ছাত্র হয়রানি গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদাকে ম্লান করছে। এছাড়া ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যতদ্রুত সম্ভব শিক্ষকদের এই জায়গা থেকে সরে আসতে হবে, সব শিক্ষার্থীকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তা না হলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে একটি প্রজন্ম, একটি জাতি তথা একটি দেশ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী অনন্য প্রতীক রাউত বলেন, শিক্ষা হোক সার্বজনীন, স্বার্থহীন। শিক্ষার হার এখন আলোচ্য বিষয় না। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, পেশাদারিত্ব, শিক্ষার্থীদের মূলধারার বাইরে যাওয়া বিষয়গুলো আজকাল সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে গুণীজনদের ভাবনায়। যদিও আমরা বিশেষ দিননির্ভর জাতি। তাই বছরের বেশিরভাগ সময় আমরা শিক্ষার আড়ালে অশিক্ষা, শিক্ষাকে ব্যবসায়িক মর্যাদা দানে সিদ্ধহস্ত হিসেবে দিন পার করে দেই।
তিনি আরো বলেন, আজকাল নানা সময়ে শিক্ষকরা নির্যাতিত হয়েছেন। পত্র-পত্রিকায় বারবার সংবাদ এসেছে। কোথাও কোনো নেতার তরফ থেকে তার অন্যায় অনুরোধ না রাখায় শিক্ষককে করা হয়েছে লাঞ্ছিত, কোথাও বা পরীক্ষার হলে নকল ধরায় হত্যা। জাতি হিসাবে এসব আমাদের ভাবমূর্তিকে কোন পর্যায়ে নিয়েছে একবার ভাবুন বা নিজেকে প্রশ্ন করুন? নানা জটিলতা বা অস্থিরতার মাঝেও শিক্ষকরা সচেষ্ট থাকেন একটি সৃজনশীল জাতি উপহার দিতে, সেখানে এ ধরনের অমানবিক তথা ক্ষমার অযোগ্য ঘটনা আমাদের হতাশ বৈকি কিছুই করে না।