অনেক দিন থেকেই তিনি কর্কট রোগে ভুগছিলেন। দেশে-বিদেশে (কানাডায়) তার উন্নত চিকিত্সাও চলছিল। কিন্তু সব প্রয়াস-প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রিয় জীবনটাকে তিনি মৃত্যুর কাছেই শেষ পর্যন্ত সঁপে দিতে বাধ্য হলেন। এ তো অপ্রিয় ও অমোঘ সত্য জীবনের পরিসমাপ্তি মৃত্যুতে। আর সে মৃত্যু পরিণত বয়সের হলেও নিজের এবং প্রিয়জনের কাছে তা প্রবল বেদনার এবং অনাকাঙ্ক্ষিতও বটে!
যতটা চিনি-জানি, আসাদ চৌধুরী ছিলেন এক অজাতশত্রু মানুষ। অমায়িক ব্যবহারের জন্য তিনি সবার কাছে আদৃত ছিলেন। তার সুপরিচিতি একজন কবি বা উপস্থাপক হিসেবেই শুধু নয়, সুভদ্র মানুষ হিসেবেও। একজন রসিক ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে তার পরিচয় সর্বত্র পরিবৃত হয়ে আছে, থাকবে।
খ্যাতিমান এ কবির জন্ম ১৯৪৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া চৌধুরীবাড়িতে। ভূস্বামী পরিবারের সন্তান আসাদ চৌধুরীর পিতা মোহাম্মদ আরিফ চৌধুরী ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। চৌধুরীবাড়ির আরো কয় জন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী, বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী, বাহাউদ্দীন চৌধুরী, আতিকুল হক চৌধুরী, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ। একই পরিবারে এতজন কীর্তিমান হওয়া এক বিরল ঘটনা এবং কম সৌভাগ্যের কথা নয়।
আসাদ চৌধুরী আরমানিটোলা হাইস্কুল, বি এম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাংলা বিভাগের) শিক্ষার্থী ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি কিছুকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে অধ্যাপনা করেছেন, এরপর সাংবাদিকতা করেছেন এবং পরে বাংলা একাডেমির চাকরিতে থিতু হয়েছেন। শেষে একাডেমির পরিচালক হিসেবে এখান থেকেই অবসরে গিয়েছেন। তার সাহিত্যিক জীবনের উন্মেষ ঘটে কৈশোরে, ছাত্রজীবন থেকেই। মূলত কবি হিসেবে তার স্বীকৃতি ব্যাপ্ত হলেও, ছড়াকার, শিশুকিশোর সাহিত্য রচয়িতা, অনুবাদকর্মে, রূপকথা ও রম্য রচনায়, জীবনীগ্রন্থ লেখায় ও গ্রন্থ সম্পাদনায় এবং গল্পকার হিসেবেও তার বুত্পত্তি ঈর্ষণীয়। সব মিলিয়ে তার গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশ।
নিরন্তর কাব্যসাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার, আবুল হাসান পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। দূর প্রবাসে, কানাডার একটি হাসপাতালে এই স্বনামধন্য কবি ৫ অক্টোবর স্থানীয় সময় বেলা ১টায় দেহত্যাগ করেছেন। নিজ কন্যা এবং স্ত্রীর তত্ত্বাবধানেই থেকেছেন অন্তিমকালে।
আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধে আসাদ চৌধুরী কলমযোদ্ধা তথা সাংবাদিক হিসেবে জয়বাংলা পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার তখন নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। এই দুই নিকট আত্মীয়র কলকাতা প্রবাসের সে দিনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে বেশ তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বিনয়ী বন্ধুবাত্সল সদালাপী এই কবিকে আর দেখা যাবে না প্রেসক্লাবে, বইমেলায়, কোনো সভা-সেমিনারে, আড্ডার মধ্যমণি হয়ে সহাস্যে! ভাবতেই মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে কবির একটি খেদাত্মক কবিতার পঙিক্ত এ রকম :
আগুন ছিল মুক্তিসেনার
স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়
প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে
কাঁপছিল সব-অন্যায়।
এখন এসব স্বপ্নকথা
দূরের শোনা গল্প,
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
এখন আছি অল্প।
৭১-এর মহান আদর্শ থেকে জাতি কতটা দূরে সরে গেলে তা দেখে একজন মুক্তিযোদ্ধা কবির মনে এমন আক্ষেপ ঝরে পড়ে, তা সহজেই অনুমেয়। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়ও যে কবি কতটা কাতর ছিলেন তা-ও বিচার্য ও বিবেচ্য।
সত্য নিয়ে তার একটি শ্লেষাত্মক ও দ্ব্যর্থক অনবদ্য কবিতা, যা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক—
সত্য ফেরারি
কোথায় পালালো সত্য?
দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো
রেস্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে,
গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে,
টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে,
নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো।
গুড়ের কলসি, বিষের কৌটো,
চিনির বয়াম, বাজারের ব্যাগ,
সিগারেট কেস, পানের ডিব্বা,
জর্দার শিশি, লক্ষ্মীর সরা,
নকশী পাতিল, চৌকির তলা,
সবি খুঁজলাম, খুঁজে দেখলাম নেই তো!
সাংবাদিকের কাঠের ডেস্কে,
কাগজে, কেতাবে, পুঁথিতে, কলমে,
ইনজেকশনে, দাঁদের মলমে,
ভ্যানিটি ব্যাগে বা পকেটে, আঁচলে
ড্রয়ারে, ব্যাংকে, আয়রন সেফে
সত্য নামক মহান বস্তু নেই তো!
কবিতায় নেই, সঙ্গীতে নেই
রমণীর চারু ভঙ্গিতে নেই
পাগলের গাঢ় প্রলাপেও নেই
নাটকের কোনো সংলাপে নেই
শাসনেও নেই, ভাষণে নেই
আঁধারেও নেই, আলোতেও নেই
রেখাতেও নেই, লেখাতেও নেই,
উত্তরে নেই, প্রশ্নেও নেই
লেবাসে নেই, সিলেবাসে নেই
পারমিটে নেই, বোনাসেও নেই
হতাশায় নেই, আশাতেও নেই
প্রেম-প্রীতি ভালোবাসাতেও নেই
এমনকি কালোবাজারেও নেই
কোথায় গেলেন সত্য?
কবির উপলব্ধিসঞ্জাত এ কবিতা, আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার ও আত্মানুসন্ধানের সবিশেষ গুরুত্ব ও অবকাশ রাখে। ব্যক্তি ও জাতীয় জীবন থেকে সত্য নির্বাসিত হলে কী করুণ ও কঠিন দুরবস্থার মধ্যে পড়তে হয়, তা হয়তো সচেতন অনেকেই উপলব্ধি করতে পারছেন। কিন্তু সত্য ছাড়া যে জীবন অচল এ সত্যই বা কজন বুঝতে চাইছেন?
সদ্যপ্রয়াত কবির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। অতল ভালোবাসা। তার মরদেহ কানাডা থেকে দ্রুত ঢাকায় এনে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উদার সহযোগিতা কামনা করি।
লেখক: সাংবাদিক