অধিকারের আদিলুর এলানের সাজা বাড়াতে হাইকোর্টে আপিল

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর দুই কর্তাব্যক্তির সাজা বাড়াতে হাইকোর্টে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সাইবার ট্রাইব্যুনালের দেওয়া শাস্তিকে অপর্যাপ্ত উল্লেখ করে সাজা বাড়ানোর এই আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় সর্বোচ্চ ১৪ বছর এবং সর্বনিম্ন সাত বছর সাজার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কোনো সাজা না দিয়ে আইনের বাইরে গিয়ে দুই বছর সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। যা আইনসংগত নয়। বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এই আপিল দায়ের করা হয়েছে।

এক দশক আগে রাজধানীতে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হেফাজতের কর্মীদের ঐ সংঘর্ষে ১১ জন নিহত হয় বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর ওয়েবসাইটে ঐ সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৬১ উল্লেখ করে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। যদিও ঐ রিপোর্টে উল্লেখিত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে কোনো দলিলাদি সরকারের কাছে দাখিল করতে পারেনি অধিকার। পাবলিক ডোমেইনে এই তথ্য বিকৃতির অভিযোগে অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলানের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করে পুলিশ। এই মামলায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর আদিলুর ও এলানকে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় দুই বছর করে কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাস করে দণ্ড দেওয়া হয়। ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ এম জুলফিকার হায়াত এ রায় দেন। এই রায় বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে ইতিমধ্যে আপিল করেছেন আদিলুর ও এলান। চেয়েছেন জামিনও। চলতি সপ্তাহে হাইকোর্টে এই জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে। শাস্তি কম দেওয়ার পেছনে বিচারক যে যুক্তি দিয়েছেন রায়ে :

সাইবার ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিচারক বলেছেন, আদিলুর ও এলান দুজনই অধিকারের কর্তাব্যক্তি। হেফাজতকাণ্ডের পর ৬১ জনের মৃত্যুর তথ্য অধিকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন তারা। এই তথ্য প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াসহ দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করা হয়। পাবলিক ডোমেইনে এ ধরনের মিথ্যা ও অসত্য তথ্য প্রকাশের ফলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ও এর নাগরিকের সম্মানহানি হয়েছে। রায়ে আরও বলা হয়েছে, পাবলিক ডোমেইনে এ ধরনের অসত্য ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই মামলার বিচার চলাকালে কখনই আদিলুর ও এলান এই মিথ্যা ও অসত্য তথ্য প্রকাশের বিষয়ে কোনো ধরনের অস্বীকার করে বক্তব্য দেননি। মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অধিকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশের তথ্য ছিল তাদের মস্তিষ্ক প্রসূত। এই রিপোর্ট তাদের ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ করেছেন। অসৎ উদ্দেশ্যেই তারা এই কাজটি করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ কারণেই তাদেরকে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হলো।

দোষী সাব্যস্তের পর দুজনের বিরুদ্ধে সাজার রায় ঘোষণা করেন বিচারক। সাজার রায়ে বিচারক বলেন, আদিলুর ও এলানের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধ সংঘটনের কোনো রেকর্ড নাই। এই মামলায় দেওয়া পুলিশের প্রতিবেদনেই তা উঠে এসেছে। তাদের সামাজিক একটা অবস্থান রয়েছে। এছাড়া মামলার প্রতিটি ধার্য দিনে বিচারের সময় তারা আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদেরকে কম সাজা দেওয়া হলো।

এই রায় পর্যালোচনা করে সাজা বাড়ানোর আপিলে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, আসামিদের কম সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে অতীত অপরাধের কোন রেকর্ড নাই ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনার নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই। কারণ এই আইনের ৫৭(২) ধারায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্ধারিত শাস্তির বাইরে গিয়ে অন্য কোনো শাস্তি প্রদান করার কোন সুযোগ বিচারকের সামনে নাই। এ কারণে আইনে নির্ধারিত শাস্তি দেওয়ার আবেদন করছি।