মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন গত বৃহস্পতিবার অনেকটা নীরবেই মেক্সিকো সীমান্তে আরো প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর ফলে বাইডেন নিজ দল ডেমোক্র্যাট ও বিরোধীদল রিপাবলিকানদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কারণ শেষপর্যন্ত তিনি পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথেই হাঁটলেন। অভিবাসী সংকট সমাধানে ট্রাম্প যে সঠিক ছিলেন, সেটাই যেন মেনে নিলেন তিনি।
মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের বিষয়টি ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি বহুল আলোচিত নীতি। এই দেওয়াল নির্মাণের জন্য ট্রাম্পকে ‘বর্ণবাদী’ আখ্যা দিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানে ট্রাম্পের এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী বাইডেন। সে সময় তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মেক্সিকো সীমান্তে আর কোনো প্রাচীর নির্মাণ করবেন না। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেন বাইডেন। দায়িত্ব নিয়েই এক আদেশে তিনি বলেছিলেন, মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণে আর কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হবে না। এখন সেই বাইডেনই মেক্সিকো সীমান্তে নতুন করে দেওয়াল তুলতে যাচ্ছেন।
মেক্সিকো সীমান্তে নতুন করে প্রাচীর নির্মাণের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-বিষয়ক মন্ত্রী আলেজান্দ্রো মায়োরকাস বলেছেন, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের জরুরি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সীমান্তের রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালি এলাকায় প্রাচীরের নতুন অংশটি নির্মিত হবে। সীমান্ত এলাকাটি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশের ঘটনা বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুসারে, এই সীমান্ত দিয়ে চলতি অর্থবছরে ২ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়েছে সেপ্টেম্বরে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গেছে। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক অ্যাডামস ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, গত বছর থেকে সেখানে যে এক লাখের বেশি নতুন অভিবাসী এসেছে, তাদের আবাসনের জন্য আগামী তিন বছর ১২শ কোটি মার্কিন ডলার খরচ হবে। এসব কারণে অবৈধ অভিবাসন বাইডেনের জন্য বড় ধরনের একটি রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। যেভাবে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের প্রবেশ বাড়ছে, তাতে নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের জন্য বিষয়টি খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বিরোধী রিপাবলিকানরা তাকে শিথিল সীমান্তনীতির জন্য দোষারোপ করে আসছিলেন।
দেওয়াল নির্মাণের ঘোষণা করে বাইডেন এখন নিজ দল এবং বিরোধীদল উভয় দিক থেকেই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। কারণ এই ডেমোক্র্যাটরা এতদিন এই দেওয়ালের বিরোধী ছিল। আর রিপাবলিকানরা বাইডেনকে ‘ভণ্ড’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। বাদ যাচ্ছে না মানবাধিকার সংগঠনগুলোও। তবে যদিও বাইডেনের যুক্তি মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণের জন্য আগেই ট্রাম্প তহবিল বরাদ্দ করে গেছেন। যে কারণে দেওয়াল নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই তার হাতে।
এই খবরের পর বাইডেনকে আক্রমণ করতে ভোলেননি ট্রাম্প। তিনি বলেন, আমিই ঠিক ছিলাম। বাইডেন কি এখন আমার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চাইবেন! বাইডেনকে আক্রমণ করে রিপাবলিকান নেতা রালফ নরম্যান বলেন, বাইডেন মনে করেননি যে দেওয়াল কাজ করবে। তাহলে এখন কি পরিবর্তন হয়েছে?
বাইডেনকে টার্গেট করতে বাদ যায়নি ডেমোক্র্যাটরাও। কংগ্রেসম্যান হেনরি কুয়েলার বিবিসিকে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে তার ভোটাররা এই ঘোষণায় খুশি হবেন। একবিংশ শতাব্দীর সমস্যার জন্য আমি এখনো ১৪ শতকের একটি সমাধানের বিরুদ্ধে। ডেমোক্র্যাট দলের আরেক কংগ্রেসম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এটিকে একটি ‘নিষ্ঠুর নীতি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বাইডেনকে আবারও উল্টো পথে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবিসির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, সীমান্ত-সংকটে ট্রাম্পের ছায়া এড়াতে পারবেন না বাইডেন। মার্কিন-মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রমকারী অভিবাসীদের সাম্প্রতিক ঢেউ বাইডেনকে রাজনৈতিকভাবে একটি কঠিন হুমকির মধ্যে ফেলেছে। রাজ্য এবং স্থানীয় গণতান্ত্রিক নেতারা যারা আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে থাকা উচিত তারা তার অভিবাসন পরিচালনার কঠোর সমালোচনা করছেন। এ অবস্থায় তার প্রতি জনসমর্থন কমতে পারে। যদি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারাভিযান শুরুর আগে সংকটটি সহজ না হয়, তবে বাইডেনকে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে তার রিপাবলিকান প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।