মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর। অর্থাত্, ইউএস প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনের বাকি আছে ১৩ মাসের কম সময়। আমরা দেখে আসছি, দুই দল তথা রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে শেষ পর্যন্ত কারা মনোনয়ন পান, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বহুদিন থেকে। ফলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন করে শুরু হলো জল্পনা-কল্পনা—উভয় দল থেকে মনোয়ন যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন কারা। লক্ষ করা যাচ্ছে, ক্ষমতার বাইরে থাকা রিপাবলিকান পার্টির মনোয়নপ্রত্যাশীরা যে যাঁর মতো করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে দলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটরা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে সামনে রেখেই এগোচ্ছেন এখন পর্যন্ত। যদিও বাইডেনের বয়স নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে দলের ভেতরে-বাইরে!
এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখতে হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বাইডেনই সবচেয়ে বয়স্ক (প্রায় ৮১ বছর) প্রেসিডেন্ট। এ কারণে প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচনে তিনি শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয় সময়ে সময়ে। তবে চলতি বছরের এপ্রিলে আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন বাইডেন। তার ঘোষণায় পরিষ্কার হয়, অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য আরও চার বছর ক্ষমতার চেয়ারে বসতে জোর চেষ্টা চালাবেন তিনি।
উল্লেখ করার বিষয়, বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছে, বেশ কিছু ডেমোক্র্যাটের চাওয়া—‘প্রার্থী হিসেবে অন্য কাউকে মনোনীত করা হোক।’ তবে বাইডেনের পরিবর্তে যাদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মনে করা হয়, খোদ তারাই বলেছেন, ‘বাইডেন যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন, তাহলে আমরা তাকে চ্যালেঞ্জ করব না।’
ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়, তেমন কিছু না ঘটলে আসন্ন নির্বাচেন ডেমোক্র্যাটরা আস্থা রাখবেন বাইডেনের ওপরই। এটা দলের জন্য ভালো না মন্দ হবে, সে কথায় যেতে চাই না। তবে ডেমোক্র্যাটদের যথেষ্ট বুদ্ধিমান বলতে হবে। এ কথা বলার কারণ, ‘প্ল্যান বি’ নিয়ে এগোচ্ছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। ডেমোক্র্যাটদের চিন্তা সম্ভবত এ রকম—বাইডেনকে চূড়ান্ত প্রার্থী ধরে অগ্রসর হলে কোনো কারণে যদি পরিকল্পনায় ছেদ পড়ে, তখন বিপদে পড়ে যেতে হবে। অর্থাত্, হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করতে হলে দ্বিতীয় পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
প্রশ্ন হলো, ডেমোক্র্যাট পার্টির ‘প্ল্যান-বি’ আদতে কী? এই প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর হলো, বাইডেনের বিকল্প হিসেবে মনোনয়নের লাইনে রয়েছেন একঝাঁক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। বার্ধক্যজনিত সমস্যা কিংবা কোনোভাবে যদি নির্বাচন থেকে ছিটকে যান বাইডেন, তার বিকল্প হিসেবে ডেমোক্র্যাট পার্টির হয়ে নির্বাচনের ময়দানে অবতীর্ণ হবেন সামনের সারির কেউ না কেউ। এখন দেখার বিষয়, ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়নের জন্য কারা রয়েছেন সামনের কাতারে।
ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিয়ে। মনোনয়নের লড়াইয়ে জো বাইডেনের সঙ্গে রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা শোনা গেলেও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে স্বতন্ত্র পদে লড়বেন বলে জানিয়েছেন কেনেডি জুনিয়র। জানিয়ে রাখা দরকার, মার্কিন রাজনীতিতে কেনেডির পূর্বপুরুষদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কেনেডি জুনিয়রের অংশগ্রহণ নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। শুধু তাই নয়, এর ফলে বাইডেনের সঙ্গে আরেক জন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব ঘটবে ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে।
ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে মারিয়ান উইলিয়ামসনের নাম। আত্মোন্নয়নবিষয়ক শিক্ষাগুরু ৭০ বছর বয়সি উইলিয়ামসন দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে আন্দোলন করে আসছেন। ২০২০ সালে রাজনীতিতে পা রাখা উইলিয়ামসন ইতিমধ্যে বেশ আলোও কেড়েছেন দলের।
অনেকের জানা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দিকে দলের মনোয়ন ঝুলে থাকে বেশ খানিকটা। এদিক থেকে বিচার করলে বাইডেনকে এগিয়ে রাখতেই হয়। তবে দলে জল ঘোলা করার লোকও থাকে কেউ কেউ! যেমন—ডেমোক্র্যাট কর্নেল ওয়েস্ট, যিনি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দিয়ে বসে আছেন। এই তালিকায় আছে ডিন ফিলিপসের নামও। বাইডেনকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিবৃতি-বক্তব্য দিতে দেখা যায় ফিলিপসকে। অবশ্য ফিলিপসের কথাবার্তা আইন প্রণেতাদের সমালোচনার মুখে পড়ে প্রায়ই।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, টিকিটের জন্য ফিলিপস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন বেশ আগেভাগেই। মাঝে মনোনয়নযুদ্ধে নামবেন না বলেও জানান। আবার হঠাত্ করেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও স্বয়ং তিনিই বলছেন, ‘মনোনয়নের জন্য আমি ছাড়া আরো অনেক উপযুক্ত প্রার্থী রয়েছেন।’ যাহোক আসল কথা হলো, ফিলিপসকে বাইডেনের বিকল্প হিসেবে যতটা না ধরা হয়, তার চেয়ে বেশি ভাবা হয়, তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিপরীতে যোগ্য খেলোয়াড়! ফিলিপসের মধ্যপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি উদারপন্থি রিপাবলিকানদেরও আকৃষ্ট করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে।
বাইডেনের বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে গভর্নরদের মধ্য থেকেও কারো কারো নাম। মিশিগানের গ্র্রেচেন হুইটমারের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। সুইং স্টেটের গভর্নর হিসেবে হুইটম্যানের বেশ সুনাম রয়েছে। বাইডেনের বিকল্প হিসেবে তাকে খুব একটা অযোগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
অন্য আরো দুই জন, অতি সম্প্রতি যাদের নাম শোনা যাচ্ছে বেশি বেশি, তারা হলেন ইলিনয় স্টেটের জেবি প্রিটজকার এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গ্যাভিন নিউজম। রিপাবলিকান রাজ্য থেকে এ দুই নেতা উঠে এসেছেন বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েই। মধ্যপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রশ্নে মনোনয়নযুদ্ধে তাদের এগিয়ে না রেখে উপায় নেই।
সিনেটরদের মধ্যে রয়েছেন ভার্জিনিয়ার মার্ক ওয়ার্নার। সুইং স্টেট ভার্জিনিয়ার জনপ্রিয় এই নেতা মনোনয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট দলের আকর্ষণীয় পছন্দ হতে পারেন। নিউ জার্সি থেকে কোরি বুকারও মনোনয়নের জন্য আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। অপেক্ষাকৃত কম বয়সি এই নেতার সামনে রাজনীতির লম্বা পথের হাতছানি রয়েছে। সুতরাং, এগিয়ে রাখতে হচ্ছে কোরি বুকারকেও।
জোর আলোচনা আছে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে নিয়েও। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বদানের প্রশ্নে কমলার সুনাম রয়েছে বেশ। এমন কথা প্রচলিত আছে—বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি নির্বাচন থেকে বাদ পড়েন বাইডেন, তবে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও মার্কিন সিনেটর হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা ৫৮ বছর বয়সি হ্যারিস ডেমোক্র্যাট পার্টির সুনজরে রয়েছেন—এমন আলোচনা নতুন নয়।
যাহোক, বহু প্রার্থীর ভিড়ে বাইডেনের ওপরে আস্থা রাখাই ডেমোক্র্যাটদের সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হবে। ক্ষমতাসীনেরা পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পেলে দল একটু বাড়তি সুবিধা পায় বইকি! সুতরাং, বাইডেনের বয়স নিয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা না করাই ভালো হবে ডেমোক্র্যাট শিবিরের জন্য।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য চিন্তার কারণ সম্ভবত এটা, খারাপ পরিস্থিতি কিংবা কঠিন চাপের মুখে পড়ে গেলে তা ঠিকঠাকভাবে সামলাতে পারবেন কি না বাইডেন। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল হাতে আসার আগ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের এমন চিন্তা বা উত্কণ্ঠাকে একেবারে অবান্তরও বলা যায় না। কারণ, নির্বাচনে এমন ছোটখাটো অনেক ঘটনা বা বিষয় থাকে, যাতে করে ক্ষমতার পাল্লা হেলে পড়ে বিপক্ষ দলের দিকে!
লেখক :মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক
‘দ্য হিল’ থেকে অনুবাদ: সুমৃত্ খান সুজন