একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করছেন আফিয়া জাহান নিপা। নিপার একটি ব্যাংক ও একটি বিকাশ অ্যাকাউন্ট আছে। ১২ বছর ধরে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করছেন তিনি। নিপার মতো অনেক নারীরই এখন একটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এপ্রিলে এজেন্ট ব্যাংক হিসাবে পুরুষের তুলনায় এগিয়ে আছেন নারী। এ সময় নারী এজেন্ট ব্যাংক হিসাবধারী ৯৫ লাখ, যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৯৪ দশমিক ৬২ লাখ। কোথাও কোথাও পুরুষের তুলনায় নারী ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা বেশি। সরকারের নানা সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমসহ বেশকিছু নারীবান্ধব সিদ্ধান্ত এর মূল কারণ বলে জানান ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। তবে এজেন্ট ব্যাংকিং ছাড়া স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। এই অংশগ্রহণ বাড়াতে সম্পত্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন সংশ্লিষ্টজনরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এজেন্ট ব্যাংকে নারীর হিসাব সংখ্যা ছিল ৪৩ দশমিক ৭৯ লাখ, যেখানে পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২১ সালের একই সময় নারীর হিসাব সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ দশমিক ৭১ লাখ, এ সময় পুরুষের এজেন্ট অ্যাকাইন্ট ছিল ৭৯ লাখ। এক বছর পর একই সময় অর্থাৎ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নারীর এজেন্ট হিসাব সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ৮৪ দশমিক ২১ লাখ এবং একই সময় পুরুষের হিসাব সংখ্যা ছিল ৮৭ দশমিক ৯৫ লাখ। আর ২০২৩ সালে পুরুষের তুলনায় নারীর হিসাব সংখ্যা বেশি হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এজেন্ট ব্যাংকিং শুধু নয়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের তথ্যমতে, ৫ দশমিক ৭২ কোটি নারী মোবাইল ব্যাংক হিসাব সেবা গ্রহণ করে। এক বছর পর ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭২ কোটি। তিন বছর পর একই সময়ের তথ্যমতে, ৮ কোটি নারী মোবাইল ব্যাংক হিসাব সেবা গ্রহণ করে। তিন বছরে সেবাগ্রহীতা সংখ্যা বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।
কেন বাড়ছে নারীর হিসাব
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নারীবান্ধব বেশ কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। নারীরা বিনিয়োগের বিশেষ সুযোগ পাচ্ছেন সঞ্চয়পত্রে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ও কম সুদে ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থাসহ আয়ের ওপর রয়েছে বাড়তি করছাড় সুবিধা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা বেশির ভাগ নারী গ্রহণ করেন। মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিধবা ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তির টাকা ঘরে বসেই তারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পান। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে (এসএমই) যে ঋণ দেয়, তার ১০ শতাংশ অর্থ নারী উদ্যোক্তাদের দিতে বলা হয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ ১৫ শতাংশে উত্তীর্ণ করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণসুবিধা রয়েছে। এসব কারণে বিভিন্ন শ্রেণির নারীদের (গৃহিণী, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা) ব্যাংক হিসাব বেড়েছে।
নারীরা যা বলেন
এজেন্ট ব্যাংকের গ্রাহক নিপা জানান, একবার তিনি ঋণ নিতে চাইলে তাকে অনেক কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়েছে। তিনি জানান, তার স্বামী দুই বছর ধরে প্রবাসী, এজেন্ট ব্যাংকে তার হিসাব আছে। তিনি ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে তাকে আয়কর দাখিল করতে বলে। তিনি এসব ঝামেলায় যেতে চান না। প্রশ্ন করেন, ব্যাংক কি তার আয়কর কেটে নিতে পারে না? একটি ফেসবুক পেজ আর ঘরে বসে ব্যবসা করেন স্নিগ্ধা দত্ত। মাঝেমধ্যেই তার ঋণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু তিনি আয়করদাতা নন, ট্রেড লাইসেন্স নেই বলে ঋণের আবেদন করতে পারেন না। তার প্রশ্ন এত ছোটো ব্যবসা, এর টিন (আয়করদাতা সনাক্তকরণ নম্বর)-এর প্রয়োজন কী আর ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই বা কী করবেন? উইমেন চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সভাপতি সালমা আহমেদ এমপি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সংবেদনশীল নয় ব্যাংকগুলোর কতিপয় সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি। নারী ঋণ ফেরত দিতে পারবে না এমন একটা ধারণাও আছে। ঋণ পেতে পুরুষের চেয়ে বেশি শর্ত পূরণ করতে হয় নারীকে।
এসএমই ও সাধারণ ব্যাংক হিসাব বাড়াতে হবে
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রমতে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এসএমই প্রণোদনা ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। যার মধ্যে নারী পায় মাত্র ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। একই সময় এসএমই ঋণ বিতরণ করা হয় ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, এখানে নারী পায় মাত্র ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এজেন্ট ব্যাংক ছাড়া নারী-পুরুষের আলাদা ব্যাংক হিসাবের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক গ্লোবাল ফিনডেক্স রিপোর্ট মতে, বিশ্বে পুরুষের ৭২ শতাংশ এবং ৬৫ শতাংশ নারীর ব্যাংক হিসাব আছে। আর এই রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ নারীর কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১৬-২০২২ সাল পর্যন্ত শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু এই নারীর জন্য ব্যাংক হিসাব বাড়েনি। ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য যে টাকা প্রয়োজন, তা নারীর হাতে থাকে না। নারীরা বেশির ভাগ আনপেইড বা পারিশ্রমিকবিহীন কাজে জড়িত। ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য নারী সম্পত্তির অধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
কিন্তু সরকারি হিসাব বলছে কমছে এই ব্যবধান। সরকারের অসমতা হ্রাসের উদ্যোগের কারণে নারীরা যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। তেমনি বাড়ছে তাদের অর্থনৈতিক লেনদেনও। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নারীরা ব্যাংকিং হিসাব খাতেও এগিয়ে যাচ্ছে। তাই নিপা বা স্নিগ্ধার মতো অনেক মেয়েরই এখন একটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এনে দিচ্ছে। ফলে কমছে ব্যাংকিংয়ে নারী-পুরুষ বৈষম্য।