‘আগে ভজ মায়ের চরণ তবে পাবে গুরুর দরশন’

আজ ১৭ অক্টোবর মহান সাধক মরমি কবি লালন সাঁইয়ের ১৩৩তম তিরোধান দিবস। লালন যুগে নারী ছিল অবরুদ্ধ, চার দেওয়ালে বন্দি, অসূর্যম্পশ্যা। নারী ছিল একধরনের দাসী। তার বাক্স্বাধীনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। সে খাবার রান্না করত, কিন্তু সে পেটপুরে খেতে পারত না। পরিবারের সকলের খাওয়া শেষে যা উচ্ছিষ্ট থাকত, তা-ই সে খেত। তাকে মানুষ মনে করা হতো না। সমাজে পর্দাপ্রথার মতো ছিল বাল্যবিবাহের প্রচলন। নারীশিক্ষা, নারীমুক্তি, নারী অধিকার, নারীস্বাধীনতা এসব ছিল অকল্পনীয়। লালন নারীকে নারী হিসেবে নয়, নারীকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তিনি ছিলেন নারীস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সে যুগেই লালন নারীজাগরণের ডাক দিয়েছেন। লালন বলেন :‘কুলের বউ হয়ে মনা আর কতদিন থাকবি ঘরে/ ঘোমটা ফেলে চল নারে যাই সাধ বাজারে’। যে যুগে কোনো বিশেষ  প্রয়োজনে নারী বের হলেও তাকে ছইওয়ালা গরুর গাড়ি বা ছইওয়ালা নৌকা বা পালকিতে যেতে হতো, ওঠানামার সময়ও তাকে বড় ঘোমটা দিয়ে ওঠানামা করতে হতো, সে যুগে এটি কম কথা নয়।

লালন নারী-পুরুষে ভেদাভেদ বা লিঙ্গবৈষম্যে বিশ্বাসী নন। নারীও একজন মানুষ। পুরুষের মতো তারও ক্ষুধা আছে, দুঃখ আছে, আনন্দ আছে, বেদনা আছে, প্রেম আছে, কাম আছে, সাধ আছে। সুতরাং তাকে বঞ্চিত ও একপেশে করে রাখার অর্থ হয় না। এক বীজ থেকেই নারী-পুরুষ সৃষ্টি হয়। নারী-পুরুষ এক ফুলের দুইটি রং। এটা একটা সৃষ্টির লীলা, প্রকৃতির খেলা, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। নারী হলো পুরুষের সঙ্গী, পুরুষ হলো নারীর সঙ্গী। নারী-পুরুষ পরস্পরের পরিপূরক। একজন ছাড়া অন্যজন অপূর্ণাঙ্গ। তাই তো লালন বলেন : ‘পুরুষ বলতে কুম্ভ ভারি, এক বীজে হয় পুরুষ-নারী/ বারিতে সৃষ্টি কারবারি এক ফুলে দুই রং ধরায়।’

লালনযুগে নারী ছিল অন্দরমহলে বন্দি। পুরুষ তার স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে বের হতো না, তাকে নিয়ে কোথাও যেত না। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কেউ বের হলে লোকে তাকে স্ত্রৈণ বলে উপহাস করত। স্ত্রীর সঙ্গে খেত না। বনের স্ত্রী পশুরাও নারীর চেয়ে ভালো অবস্থায় ছিল। তারা পতির সঙ্গে একসঙ্গে খেতে পারত, ঘুরে বেড়াতে পারত। বনের পশুরা পারলেও সমাজের নারীরা তা পারত না। মনুষ্যসমাজের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে রাধিকার কতই-না আকুতি ছিল! তাকে দিয়ে লালন সমাজকে বিদ্রুপাত্মক পন্থায় বলেন :‘বনেরও পশু যারা আমার থেকে ভালো তারা/ সঙ্গে লয়ে থাকে আপন পতিরে/ তারা একসঙ্গে করে আহার পতির সঙ্গে করে বিহার/ লালন বলে মজে থাকে আপন পিরিতে’

সন্তান প্রজননে, উত্পাদনে, লালনপালনে নারীর ভূমিকা তুলনাহীন। নারীর উদরে জন্ম নিয়ে, নারীর দুগ্ধ পান করে নারীকে অবমাননা এ যেন এক অমানবিক ভাবনা। অথচ প্রকৃত পিতার পরিচয় মাতাই দিতে পারেন, অন্য কেউ নয়। তাই লালন বলেন : ‘নিগূঢ় বিচারে সত্য তাই গেল যে জানা/ মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা’

অনেকে আছেন পিতামাতা, সংসার ত্যাগ করে, সাধুর বেশ ধরে, সাদা কাপড় পরে আশ্রমে আশ্রমে ঘুরে বেড়ায় পরম মানুষের সন্ধানে। লালনের দৃষ্টিতে যারা পিতামাতাকে ত্যাগ করে তাদের আবার ধর্ম কী? তারা ধর্মের মর্ম জানে না। তিনি তাদেরকে সাধুর বেশভূষা ছেড়ে মাকে ভক্তির কথা বলেছেন, মায়ের নির্দেশ পালনের কথা বলেছেন। ‘আগে ভজ মায়ের চরণ তবে পাবে গুরুর দরশন।’

লালনের বিভিন্ন গানে বিভিন্ন নারী চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। যেমন মা আমেনা, ফাতেমা, যশোদা, রাধা, সুভদ্রা, দেবকী, গোপী, রাইকিশোরী, চন্দ্রাবলী, বিন্দে, লক্ষ্মী, সরস্বতী, বোষ্টমী প্রমুখ। নারীকে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসার জন্য তিনি তার গানে এত নারী চরিত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। একটি জাতির বা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা হচ্ছে নারী। অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘরে আবদ্ধ রেখে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। নারীও দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। সাম্যের কবি লালন নারীকে ঘরকুনো কুলের বউ থেকে উঠে এসে সমাজ উন্নয়নে, দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর